জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, শেখ হাসিনা সরকারের পতন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। প্রথম আলোর সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ছাত্র প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা কঠিন হতো।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক নাহিদ ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুর পরই তাঁদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে আন্দোলনটি আর কেবল কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর ভাষায়, ওই ঘটনাই আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয়।
ডিবি হেফাজতে নেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আন্দোলন বন্ধের যে ভিডিও বক্তব্য প্রচার করা হয়েছিল, সেটি ছিল কৌশলগত পরিস্থিতির ফল। তাঁর দাবি, ডিবি কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সুযোগ তৈরির জন্য তাঁরা সাময়িকভাবে সেই অবস্থান নিয়েছিলেন। পরে বেরিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ করেন, ভিডিও বক্তব্যটি গণমাধ্যমে প্রচার করা হবে—এমন তথ্য তাঁদের জানানো হয়নি।
৩ আগস্ট ঘোষিত এক দফা আন্দোলনের বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, তাঁদের লক্ষ্য ছিল শুধু সরকারের পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার। তাঁর মতে, কেবল প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন করলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব হতো না। তাই “ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ” এবং নতুন রাষ্ট্রীয় বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার বিষয়টি দাবির অংশ করা হয়।
তিনি জানান, প্রথমে ৬ আগস্ট কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও পরে সেটি ৫ আগস্টে আনা হয়। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, কারফিউ, মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ এবং সম্ভাব্য যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা। পাশাপাশি সরকারকে প্রস্তুতির সুযোগ না দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় ছিল বলে জানান তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে সেনাবাহিনীর অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। যদি নিরাপত্তা বাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করত বা গণহত্যার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো, তাহলে সশস্ত্র প্রতিরোধের আহ্বান জানানো হতে পারত। এ ধরনের একটি ভিডিও বার্তাও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল বলে তিনি জানান।
সরকার পতনের দিনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, সকাল থেকে ঢাকার পরিস্থিতির খবর নেওয়া হচ্ছিল। পরে শাহবাগে পৌঁছানোর পর বিভিন্ন সাংবাদিক ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর পান। তবে বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি সেটিকে সম্ভাব্য ফাঁদ বলেও সন্দেহ করেছিলেন।
৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের বৈঠকের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁদের সঙ্গে সরাসরি কোনো যোগাযোগ হয়নি। এমনকি ডাক পেলেও ক্যান্টনমেন্টে যেতেন না বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, আন্দোলনের বৈধতা এসেছে জনগণের ম্যান্ডেট থেকে, কোনো সামরিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নয়।
নাহিদ ইসলাম জানান, ৫ আগস্ট রাতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে জাতীয় সরকার, রাষ্ট্র সংস্কার এবং অন্তর্বর্তী সরকারের কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, তাঁদের পক্ষ থেকে জাতীয় সরকারের প্রস্তাব দেওয়া হলেও বিএনপি তাতে অংশ নিতে রাজি হয়নি।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে সরকারপ্রধান হিসেবে বেছে নেওয়ার বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, তাঁর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তাঁকেই সবচেয়ে উপযুক্ত মনে হয়েছিল। তিনি জানান, ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় তিনি নিজেই অধ্যাপক ইউনূসকে দেশের দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ জানান।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, জাতীয় সরকার না হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারকে রাজনৈতিক বৈধতা দিতে ছাত্র প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন ছিল। তাঁর ভাষায়, “আমরা না গেলে অন্তর্বর্তী সরকারের টিকে থাকা কষ্ট হতো।”
৬ আগস্ট সরকারের কাঠামো নিয়ে আলোচনায় সেনাবাহিনী প্রথমদিকে অধ্যাপক ইউনূসের পরিবর্তে অন্য কারও নাম বিবেচনার কথা বলেছিল বলে দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। পরে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরে তাঁদের সম্মত করা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ৫ আগস্টের আগে তাঁর ব্যক্তিগতভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা হয়নি। তবে ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। পরবর্তীতে বিএনপির সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে আলোচনা হলেও অধিকাংশ প্রস্তাব তারা গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলামের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো নির্বাচন আয়োজন, সংসদ গঠন এবং রাজনৈতিক উত্তরণ নিশ্চিত করা। তবে মৌলিক রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়নে সরকার সফল হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, সংবিধান পুনর্লিখনের পরিবর্তে বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করা ছিল একটি ভুল সিদ্ধান্ত।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পর দেশের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত পরিবর্তন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁর দাবি, ক্ষমতার কেন্দ্রিকরণ আগের মতোই রয়ে গেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আরও বেড়েছে। তবে তিনি মনে করেন, অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ বলা যাবে না; কারণ এর মাধ্যমে রাজনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।
সাক্ষাৎকারের শেষ প্রশ্নের উত্তরে নাহিদ ইসলাম বলেন, অতীতের কোনো বড় সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের প্রয়োজন তিনি দেখেন না। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নির্ভর না করে নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন দ্রুত গড়ে তোলা উচিত ছিল বলে তাঁর উপলব্ধি।
