জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দেশের মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তির এক অনন্য উদাহরণ বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, দেশের সর্বস্তরের মানুষ এক কাতারে দাঁড়ালে সবচেয়ে দুর্ভেদ্য বলে বিবেচিত কাঠামোও পরিবর্তন করা সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি গণতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
বুধবার (৫ আগস্ট) ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে অধ্যাপক ইউনূস এসব কথা বলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে যে গণ-অভ্যুত্থান চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে, তার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এই বিবৃতি দেওয়া হয়। ওই সময় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে যান এবং ৮ আগস্ট অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
বিবৃতিতে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, জুলাই বাংলাদেশের গণমানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর ভাষায়, “গণমানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী জুলাই। আমাদের স্মৃতিতে জুলাই দীর্ঘ, ৩৬ দিনের মাস। জুলাইয়ে আমরা আবারও স্মরণ করি কী ভীষণ শক্তি নিয়ে এ জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে।”
তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন গণ-অভ্যুত্থানে জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের। একই সঙ্গে আহত, দৃষ্টিশক্তি হারানো এবং স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, জুলাই শুধু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা একটি জাতীয় গণজাগরণ। তাঁর মতে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা এবং সরকারি-বেসরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক, সাংবাদিক, আলোকচিত্রী, পথচারী, রাজনীতিবিদ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, লেখক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নিজেদের অবস্থান থেকে আন্দোলনে অবদান রেখেছেন।
বিবৃতিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, রিকশাচালক, শ্রমজীবী মানুষ, বিভিন্ন পেশার কর্মজীবী, চিকিৎসক এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আহতদের চিকিৎসায় চিকিৎসকেরা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসীরা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
নারীদের ভূমিকাও বিশেষভাবে তুলে ধরেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি বলেন, জুলাইয়ে নারীরা যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নারীদের অনুপ্রাণিত করবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব বাংলাদেশের তরুণ সমাজের জন্য দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিবৃতির শেষাংশে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে, দেশের সর্বস্তরের মানুষ যখন ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন তারা সবচেয়ে দুর্ভেদ্য বলে মনে হওয়া কাঠামোকেও বদলে দিতে পারে। ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে আমরা যে গণতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রা শুরু করেছি, এটা অব্যাহত রাখার জন্য আমাদের দৃঢ় সংকল্প নিতে হবে।”
তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল শিক্ষা হলো জাতীয় ঐক্য। সেই ঐক্যের ভিত্তিতেই দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।
