২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে দ্রুত বদলে যাওয়া রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে ক্ষমতা ছাড়েন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর জনগণের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগে অনাগ্রহ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং ঢাকামুখী জনস্রোতের বাস্তবতায় শেষ পর্যন্ত তিনি দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে সামনে এসেছে ২০২৪ সালের ৩ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত টানা কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহের নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ক্ষমতা ছাড়ার সিদ্ধান্ত হঠাৎ নেওয়া হয়নি। বরং শেষ কয়েক দিনে সেনাবাহিনী, বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা এবং গণভবনে ধারাবাহিক বৈঠকের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে।
সূত্রগুলো জানায়, ৩ আগস্ট সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা সদরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি দরবারে মিলিত হন। সেখানে কর্মকর্তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করবে না। সামরিক কর্মকর্তারা মত দেন, সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত ভারী অস্ত্র সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে প্রয়োগ উপযুক্ত নয়।
এদিকে আন্দোলন যত বিস্তৃত হতে থাকে, ততই সাধারণ মানুষ ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের একটি অংশ সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকার আহ্বান জানাতে থাকেন। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় সেনাবাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
৪ আগস্ট গভীর রাত পর্যন্ত গণভবনে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মন্ত্রিসভার সদস্য, আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আন্দোলন দমন, জরুরি অবস্থা জারি এবং অন্যান্য বিকল্প নিয়ে আলোচনা হলেও পরিস্থিতি দ্রুত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল।
একাধিক সূত্রের দাবি, ওই রাতেই সেনাপ্রধান শেখ হাসিনার সঙ্গে পৃথক বৈঠকে তাঁকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে পরামর্শ দেন। আলোচনার সময় তিনি শেখ হাসিনাকে বলেন, “স্যার, আপনার হাতে আর সময় নেই।” বৈঠকে শেখ রেহানাও উপস্থিত ছিলেন।
৫ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে শেখ হাসিনা আবারও সেনাপ্রধানকে গণভবনে ডাকেন। একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন শেখ হাসিনার হাতে নিজের লেখা পদত্যাগপত্র ছিল এবং তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানার পর সেনাপ্রধান সেনা সদরে ফিরে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেন, যাতে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর সম্ভাব্য অরাজকতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
সেনা সদর-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, সেদিন ভোরেই ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক হামিদুল হককে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সেনা সদরের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
গণভবন-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, পদত্যাগের পর শেখ হাসিনা ভারত সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। পরদিন, ৬ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর রাজ্যসভায় জানান, শেখ হাসিনা খুব অল্প সময়ের নোটিশে ভারতে সাময়িক আশ্রয়ের অনুমতি চেয়েছিলেন এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ তাঁর বহনকারী বিমানের উড্ডয়নের অনুমতির অনুরোধ জানিয়েছিল।
৫ আগস্ট দুপুর ২টা ২৫ মিনিটের দিকে শেখ হাসিনা তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে গণভবনের পেছনের সাবেক বাণিজ্য মেলা মাঠ থেকে বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে কুর্মিটোলা ঘাঁটির উদ্দেশে রওনা হন। পরে সেখানে থেকে একটি সি-১৩০ পরিবহন বিমানে ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, বিমানটি স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৩৬ মিনিটে নয়াদিল্লির কাছে গাজিয়াবাদের হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। সেখানে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল তাঁকে অভ্যর্থনা জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ৫ আগস্ট সকাল থেকেই উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, সাভারসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ গণভবনের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। জনসমাগমের চাপ বাড়তে থাকায় শেখ হাসিনার দেশত্যাগের প্রস্তুতি দ্রুত সম্পন্ন করা হয়। পরিস্থিতি এতটাই দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল যে, তিনি রান্না করা খাবারও খেতে পারেননি বলে সূত্রগুলোর দাবি।
আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আনতে ৪ আগস্ট সশস্ত্র দলীয় কর্মীদের মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। একই সময়ে জরুরি অবস্থা জারির বিষয়টিও আলোচনায় ছিল। তবে ১৯ জুলাই থেকে কারফিউ ও সেনা মোতায়েনের পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় সেই পরিকল্পনার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা সংকটের গভীরতা বুঝলেও ক্ষমতা ছাড়ার বিষয়ে দীর্ঘ সময় অনিচ্ছুক ছিলেন। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
বর্তমানে কারাবন্দী সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেন, ৪ আগস্ট গণভবনের বৈঠকে সরকারকে বাস্তব পরিস্থিতির তথ্য জানানো হলেও তা গুরুত্ব পায়নি।
তাঁর ভাষায়, “আমরা চেষ্টা করেছি সরকারকে সঠিক তথ্য দিতে। সরকার তার দুর্বলতা শুনতে প্রস্তুত ছিল না। এই মিটিংয়ে থাকা অবস্থায় পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে থাকে এবং বিভিন্ন স্থানে সমস্যা দেখা দেয়। পরে বৈঠক মুলতবি হয়।”
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর প্রকাশের পর আওয়ামী লীগের বহু নেতা, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য আকস্মিক পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েন। কেউ আত্মগোপন করেন, কেউ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে চলে যান। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, দলের অনেকেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস করেছিলেন যে জরুরি অবস্থা বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩ থেকে ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক পর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে। সেনাবাহিনীর জনগণের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে অনাগ্রহ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং গণআন্দোলনের বিস্তৃত চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন। তাঁর আকস্মিক প্রস্থানের ফলে সরকারি দল ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে তাৎক্ষণিক অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
