২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য দেশ ছেড়ে বিদেশে অবস্থান করছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য উঠে এসেছে। অন্যদিকে, একই সময়ে আওয়ামী লীগের বহু সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতা বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।
সরকার পতনের আগে ও পরবর্তী সময়ে শেখ পরিবারের সদস্যদের দেশত্যাগের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে, যখন ২০২৪ সালের ৩ আগস্টের একটি ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই অডিওতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেন। কথোপকথন থেকে জানা যায়, তিনি সিঙ্গাপুর যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন, তবে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাঁকে আটকে দেয়।
সরকার পতনের দিন শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশ ছাড়েন তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা। আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তিনি বর্তমানে ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে অবস্থান করছেন। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আগেই যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন এবং পরে ভারতে গিয়ে মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। অন্যদিকে, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের কার্যালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে দিল্লিতে অবস্থান করছিলেন। বর্তমানে তিনি দিল্লি ও দুবাইয়ে অবস্থান করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক (ববি) সরকার পতনের সময় থাইল্যান্ডে ছিলেন বলে জানা গেছে। আর তাঁর মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে সেখানেই অবস্থান করছেন।
দলীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ অনেক আত্মীয় সরকার পতনের আগে বা পরে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে চলে যান। তাঁদের মধ্যে শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শেখ ফজলে নাঈম, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, সাদিক আবদুল্লাহ, শেখ হেলাল উদ্দীন, শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, শেখ তন্ময়, নূর-ই-আলম চৌধুরী (লিটন) এবং মজিবুর রহমান চৌধুরী (নিক্সন চৌধুরী)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাঁদের অধিকাংশ বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।
সূত্রগুলোর আরও দাবি, শেখ পরিবারের কয়েকজন সদস্য সাতক্ষীরা, সিলেট ও ময়মনসিংহ সীমান্ত ব্যবহার করে দেশ ছাড়েন। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে তাঁদের দেশত্যাগ সম্ভব হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব দাবির স্বাধীন যাচাইয়ের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সরকার পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের বহু সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতাকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে কারাগারে থাকা নেতাদের মধ্যে রয়েছেন মুহাম্মদ ফারুক খান, শাজাহান খান, কামরুল ইসলাম, দীপু মনি, আহমদ হোসেন, আবদুস সোবহান গোলাপ, কাজী জাফর উল্যাহ, মো. আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।
রাজনীতিবিষয়ক লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “শেখ হাসিনার দুটি প্রিয় বিষয় হচ্ছে ক্ষমতা ও জ্ঞাতি–গোষ্ঠীপ্রীতি। তিনি ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। ব্যর্থ হওয়ার পর জ্ঞাতি–গোষ্ঠীকে নিরাপদে পালাতে সহায়তা করেছেন।” তাঁর মতে, দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে পরিবারকেন্দ্রিক ক্ষমতার কাঠামো গড়ে উঠেছিল, যেখানে আত্মীয়স্বজন, কিছু ব্যবসায়ী ও পদধারীরা বেশি সুবিধা ভোগ করেছেন, অথচ সাধারণ নেতা-কর্মীরা সেই সুবিধা পাননি।
