বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ শ্রেণির পণ্য আমদানি হলেও অল্প কয়েকটি পণ্যই মোট আমদানির বড় অংশজুড়ে রয়েছে। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ৪৬টি কাস্টমস স্টেশন দিয়ে মোট ১৫ কোটি ৮৬ লাখ টন পণ্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ পণ্যের পরিমাণ ৯ কোটি ৯৮ লাখ টন, অর্থাৎ মোট আমদানির প্রায় ৬৩ শতাংশ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও এর মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। শীর্ষ আমদানি পণ্যের তালিকায় মূলত শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি এবং অবকাঠামো নির্মাণের উপকরণ রয়েছে। খাদ্যশস্যের মধ্যে একমাত্র গম এ তালিকায় স্থান পেয়েছে।
পরিমাণের হিসাবে ২০০০-০১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত টানা ২৫ বছর দেশের সবচেয়ে বেশি আমদানি হওয়া পণ্য ছিল সিমেন্ট তৈরির প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকার। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই অবস্থান দখল করেছে কয়লা।
গত অর্থবছরে দেশে ২ কোটি ৭ লাখ টন কয়লা আমদানি হয়েছে। দেশে একের পর এক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি হিসেবে কয়লার ব্যবহার বেড়েছে। গত অর্থবছরে আমদানি করা কয়লার প্রায় ৭৫ শতাংশ ব্যবহার করেছে ছয়টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
ফলে শিল্পকারখানার জ্বালানি ও কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাহিদার কারণে কয়লা পরিমাণের হিসাবে দেশের সবচেয়ে বড় আমদানি পণ্যে পরিণত হয়েছে।
শীর্ষস্থান হারিয়ে ক্লিংকার এবার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ১ কোটি ৯২ লাখ টন ক্লিংকার আমদানি হয়েছে।
সিমেন্ট উৎপাদনে ব্যবহৃত অন্যান্য কাঁচামালের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য আমদানি হয়েছে। তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে থাকা স্ল্যাগ আমদানি হয়েছে ৮৩ লাখ টন। ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা চুনাপাথর আমদানি হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টন। আর দশম অবস্থানে থাকা ফ্লাই অ্যাশ বা ছাই এসেছে প্রায় ৫০ লাখ টন।
চার ধরনের এসব সিমেন্ট কাঁচামাল মিলিয়ে মোট আমদানির পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ৮৫ লাখ টন। ফলে শীর্ষ ১০ আমদানি পণ্যের তালিকায় সিমেন্টশিল্পের কাঁচামালের আধিপত্য স্পষ্ট।
তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চূর্ণ পাথর। গত অর্থবছরে এ পণ্য আমদানি হয়েছে ১ কোটি ৬৮ লাখ টন। সড়ক, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণকাজে চূর্ণ পাথর ব্যবহৃত হয়।
এ ছাড়া ৫৫ লাখ টন বোল্ডার পাথর আমদানি হয়েছে, যা তালিকায় অষ্টম অবস্থানে রয়েছে। নদীশাসনসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজে বোল্ডার পাথর ব্যবহার করা হয়।
শীর্ষ ১০ আমদানি পণ্যের তালিকায় খাদ্যপণ্য হিসেবে রয়েছে শুধু গম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭৪ লাখ ৩৪ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে। পরিমাণের হিসাবে এর অবস্থান পঞ্চম।
দেশের গমের চাহিদার আনুমানিক ১৫ শতাংশ স্থানীয় উৎপাদন থেকে আসে। বাকি প্রায় ৮৫ শতাংশ চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এ কারণে খাদ্যশস্যের মধ্যে গমই সবচেয়ে বেশি আমদানি হওয়া পণ্য।
পুরোনো লোহার স্ক্র্যাপ বা লোহার টুকরো রয়েছে সপ্তম অবস্থানে। গত অর্থবছরে প্রায় ৫৭ লাখ টন স্ক্র্যাপ আমদানি হয়েছে।
দেশের ইস্পাত কারখানাগুলোতে এসব স্ক্র্যাপ গলিয়ে বিলেট তৈরি করা হয়। পরে সেই বিলেট ব্যবহার করে রডসহ বিভিন্ন ধরনের ইস্পাতপণ্য উৎপাদন করা হয়।
দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি রয়েছে নবম অবস্থানে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৫১ লাখ টন এলএনজি আমদানি করা হয়েছে।
দেশীয় গ্যাসের সরবরাহঘাটতি পূরণে কয়েক বছর ধরে এলএনজি আমদানি করছে বাংলাদেশ। আমদানির পর এলএনজিকে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
শীর্ষ ১০ আমদানি পণ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, তালিকায় জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল এবং অবকাঠামো নির্মাণের উপকরণই প্রধান। কয়লা ও এলএনজির মতো জ্বালানির পাশাপাশি সিমেন্ট ও ইস্পাতশিল্পের কাঁচামাল এবং নির্মাণসামগ্রী রয়েছে তালিকায়। ভোগ্যপণ্য হিসেবে একমাত্র গম জায়গা পেয়েছে।
এ বিষয়ে সিমেন্ট ও ভোগ্যপণ্য খাতের উদ্যোক্তা এবং চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, ‘পরিমাণে সবচেয়ে বেশি আমদানি হওয়া পণ্যগুলোর বেশির ভাগই শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি ও অবকাঠামো নির্মাণের উপকরণ। এর মধ্যে সিমেন্ট ও ইস্পাত খাতের কাঁচামালই পাঁচটি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগ বাড়লে এসব পণ্যের চাহিদাও বাড়বে।’
অর্থাৎ পরিমাণের বিচারে বাংলাদেশের আমদানির বড় অংশ সরাসরি ভোক্তার ব্যবহারের জন্য নয়; বরং বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা পরিচালনা এবং অবকাঠামো নির্মাণের মতো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে।
