বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দীনের কাছে তাঁর মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়। সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় আনুষ্ঠানিকতা শেষে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল।
একই দিনে রাষ্ট্রপতি পদে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মনোনয়নপত্রও জমা পড়েছে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট বিকেল চারটা। প্রার্থী দুজনই বহাল থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোট হবে। এতে ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
সর্বশেষ ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি সংসদীয় ভোট হয়েছিল। ওই নির্বাচনে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে বিএনপির আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি হন। এরপর ক্ষমতাসীন দলগুলোর মনোনীত সাতজন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এবার বিরোধী জোট প্রার্থী দেওয়ায় দীর্ঘ বিরতির পর আবারও ভোটের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে সংসদে আসনসংখ্যার হিসাবে ফলাফল নিয়ে বড় কোনো অনিশ্চয়তা নেই।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনসহ সদস্যসংখ্যা ৩৪৯। এর মধ্যে বিএনপির সদস্য ২৪৭ জন। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের সদস্য ৯০ জন। বাকি সদস্যরা স্বতন্ত্র ও কয়েকটি ছোট দলের। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্যে ভোট দেন। ফলে বর্তমান সংখ্যার সমীকরণে মির্জা ফখরুলের জয় নিশ্চিত বলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
তফসিল অনুযায়ী, ১৬ আগস্ট রোববার মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে। ১৮ আগস্ট বিকেল চারটা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা যাবে। বৈধ প্রার্থী একজন হলে তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। দুজন প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট বেলা দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোট হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গোপন নয়। সংসদ সদস্যরা ব্যালটে প্রার্থীর নামের পাশাপাশি নিজেদের নাম ও আসন নম্বর লিখবেন। বিএনপির চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকায় দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়ে ভিন্ন আইনি মতও রয়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রায় ১৬ বছর বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১১ সালে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন এবং ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নির্বাচিত হন। খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব এবং তারেক রহমানের দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার সময়ে দল পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক মামলায় তাঁকে ছয়বার কারাগারে যেতে হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হওয়ার পর তিনি বিএনপির মহাসচিব ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বলে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের প্রার্থিতা চূড়ান্ত করার আগে গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে তিনি মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত জানান।
পরে রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের বিষয়টি জানান। বেলা আড়াইটার দিকে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীনের কাছে জমা দেয়। এতে প্রস্তাবক ও সমর্থক ছিলেন বিএনপির দুই জ্যেষ্ঠ নেতা ও সংসদ সদস্য আবদুল মঈন খান ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে সচিবালয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক এবং মন্ত্রিসভায় রদবদল নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে বৈঠকে থাকা একাধিক নেতা জানান, সেখানে স্থায়ী কমিটির কোনো দলীয় বৈঠক হয়নি এবং মন্ত্রিসভার রদবদল নিয়েও কোনো আলোচনা হয়নি।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘গতকালের বৈঠকে একমাত্র রাষ্ট্রপতির বিষয় ছাড়া আর কোনো আলোচনাই হয়নি। মন্ত্রিসভার রদবদল এবং আমাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমসহ কিছু গণমাধ্যমে যে খবর ছড়ানো হয়েছে, তাতে আমি বিব্রত।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁদের ডেকে সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন; সেখানে বিএনপির কোনো দলীয় বৈঠক হয়নি।
বৈঠকে খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, রুহুল কবির রিজভী, নূরুল ইসলাম মনি, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী, হাবিব উন নবী খান সোহেল, এমরান সালেহ প্রিন্স, আবদুস সালাম আজাদ, আশরাফ উদ্দীন নিজান, মিয়া নুরুদ্দীন অপু ও রকিবুল ইসলামসহ দলের কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রপতি পদে ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মনোনয়নপত্র প্রথমে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে জমা দেওয়া হয়। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তা সিইসির কাছে দাখিল করেন।
অলি আহমদের মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক হয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এবং সমর্থক এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমীন। এ সময় ১১-দলীয় ঐক্যের কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন।
বেলা তিনটার দিকে অলি আহমদের আরেকটি মনোনয়নপত্রও জমা দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতি পদে একজন প্রার্থী একাধিক মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেন। ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, রাষ্ট্রপতি পদে দুই প্রার্থীর মোট তিনটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে—মির্জা ফখরুলের একটি এবং অলি আহমদের দুটি। আইন অনুযায়ী, প্রথম মনোনয়নপত্র বৈধ হলে একই প্রার্থীর দ্বিতীয় মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের প্রয়োজন হবে না।
বিরোধী জোটের নেতারা জানিয়েছেন, নিশ্চিত পরাজয়ের সম্ভাবনা থাকলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হতে না দেওয়া এবং জনগণের সামনে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতেই অলি আহমদকে প্রার্থী করা হয়েছে। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এর আগে বলেছিলেন, জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলে তা আরও গ্রহণযোগ্য হতো।
অলি আহমাদ একসময় বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য তিনি বীর বিক্রম খেতাব পান। জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন এবং বিএনপি সরকারের সময়ে একাধিকবার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সালে বিএনপি ছেড়ে তিনি এলডিপি গঠন করেন। জাতীয় নির্বাচনের আগে তাঁর দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটে যোগ দেয়।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর বিএনপির মহাসচিব পদে তাঁর উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তাঁর মন্ত্রিত্ব ও সংসদ সদস্যের পদও শূন্য হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। পরে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়ার মধ্যেই তিনি মন্ত্রীর পদ ছাড়বেন বলে বিএনপি ও সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করে সেখানে উপনির্বাচন হবে।
বিএনপির নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন মহাসচিব বা ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেবেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে দলের পরবর্তী কাউন্সিল পর্যন্ত জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়।
এখন ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ধাপ বাকি। দুজন প্রার্থী বহাল থাকলে ২০ আগস্ট সংসদে ভোট হবে। সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বঙ্গভবনে যাওয়ার পথই সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
