চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে একটি জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে আট শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আজ শুক্রবার সকাল নয়টার দিকে স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ড ও রিসাইক্লিং কারখানায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে সাতজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁদের মধ্যে ছয়জনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরে ঘটনাস্থল থেকে আরও দুজনের লাশ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
নিহত আটজনের মধ্যে চারজনের পরিচয় জানা গেছে। তাঁরা হলেন সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭) এবং দুই সহোদর মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)। তাঁরা সবাই ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সকালে হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে চিৎকার শুনতে পান তাঁরা। পরে সেখানে গিয়ে কয়েকজন শ্রমিককে অসুস্থ অবস্থায় গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখেন। এরপর জাহাজের ভেতরে কয়েকজন শ্রমিকের মরদেহ পড়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন উত্তেজিত হয়ে কারখানায় ঢুকে ভাঙচুর করেন। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
কারখানা থেকে ছড়িয়ে পড়া গ্যাসের তীব্রতা আশপাশের এলাকাতেও অনুভূত হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। তাঁদের একজন জানান, সাগর থেকে ইলিশ ধরে ফেরার পথে দুটি নৌকা গ্যাসের গন্ধের কারণে কারখানার পাশের খালে ঢুকতে পারেনি। পরে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে নৌকা ভেড়াতে হয়।
কারখানার মালিকের প্রতিনিধি মো. মহিউদ্দিন বলেন, তিনি তখন কারখানার বাইরে ছিলেন। কারখানা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাহাজে থাকা ছয় থেকে আটজন শ্রমিক অসতর্কতার কারণে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়েছেন। কারখানায় গিয়ে তিনি বিস্তারিত জানাবেন বলেও জানান।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক ইশতিয়াক রহমান জানান, কারখানা থেকে দুই দফায় সাতজনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাঁদের মধ্যে ছয়জনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। মরদেহগুলো হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। অপর একজনের চিকিৎসা চলছে।
অন্যদিকে সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলমগীর জানান, ঘটনাস্থলে আরও দুজনের মরদেহ রয়েছে।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে সকালে ঘটনাস্থলে যায় ফায়ার সার্ভিস। চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম জানান, ফেরদৌস স্টিলের ইয়ার্ডে যে জাহাজটি কাটা হচ্ছিল, সেটি এলএনজি বহন করত।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে ভেতরের ট্যাংক ও সংশ্লিষ্ট অংশ সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত করা প্রয়োজন। কিছু ট্যাংকে ফ্লোরিন, কার্বন মনোক্সাইড ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো গ্যাস থাকতে পারে।
তৌফিকুল ইসলাম বলেন, কারখানা কর্তৃপক্ষ জাহাজের ট্যাংক গ্যাসমুক্ত না করেই কাটার কাজ শুরু করায় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে তাঁরা ধারণা করছেন। ঘটনাস্থলে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থাও যথেষ্ট দুর্বল ছিল বলে তিনি জানান।
দুর্ঘটনার পর কারখানায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিহত শ্রমিকদের স্বজনেরা ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে গিয়ে আহাজারি করেন। ঘটনার কারণ এবং কারখানায় নিরাপত্তাব্যবস্থার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
