প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার হয়েছে। চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে দুই দিনের সফর আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। তবে সফর চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে আছে দিল্লিতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু। একই সময়ে দুই দেশই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ খুঁজছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ঢাকা একটি ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের পাশাপাশি ভারতে থেকে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যের বিষয়েও বাংলাদেশের উদ্বেগ রয়েছে। এসব বিষয়ে ভারতের কাছ থেকে নিশ্চয়তা চায় ঢাকা।
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথমবার সৌজন্য সাক্ষাতের পর গত সোমবার দিল্লি যান। সেখানে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ দেশটির শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করেন। গতকাল শুক্রবার দুপুরে তিনি ঢাকায় ফেরেন।
কূটনৈতিক সূত্রের ভাষ্য, দিল্লি সফরে দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে দেওয়া বার্তা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছেন। দুই দেশের ‘জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক’ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ভারতের অবস্থান ও দিকনির্দেশনাও তিনি নিয়ে এসেছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ঢাকার সরকারি সূত্র জানিয়েছে, দীনেশ ত্রিবেদী আজ শনিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন। সেখানে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরসহ দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি ও দ্য ট্রিবিউনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণকে সফরসংক্রান্ত আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্য ট্রিবিউন নিজস্ব সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে অগ্রগতি না হলে তারেক রহমানের ভারত সফর হবে না—এমন বার্তা দীনেশ ত্রিবেদীকে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রসঙ্গ ভারতের রাজ্যসভাতেও উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য রাজীব কুমার বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারত সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং ওই প্রশ্নের জবাব দেননি। তবে একই সদস্যের অন্য তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন তিনি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়েও তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। আগস্টে সফরটি হবে কি না, ব্রিকসের আগে না পরে হবে, কিংবা শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সঙ্গে সফরের কোনো শর্ত যুক্ত আছে কি না—এসব বিষয়ে জানতে চান সাংবাদিকেরা।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারত আসার আমন্ত্রণ আগেই জানানো হয়েছে। পরে তাঁকে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে এবং ব্রিকসের আসরেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হলে তা জানানো হবে।
গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনা অনলাইনে প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই রাতেই এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি দেয়। এতে বলা হয়, দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ। তাঁর বক্তব্য ও তাঁর সহযোগীদের বক্তব্যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর সময়ে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার ওই মতবিনিময়কে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
এর দুই দিন পর, ৭ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ‘ওই মঞ্চ (শেখ হাসিনার মতবিনিময়) থেকে যা কিছু বলা হয়েছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের বৈধভাবে গঠিত (ডিউলি কনস্টিটিউটেড) সরকারের বিরুদ্ধে, তা ভারত সরকার অনুমোদন করে না।’
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে দুই দেশের অবস্থান এখনো অভিন্ন না হলেও সম্পর্কের অন্যান্য ক্ষেত্রে যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে ঢাকা ও দিল্লি আগ্রহী। দিল্লিও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
সম্ভাব্য তারেক রহমান-মোদি বৈঠকে বাণিজ্য, ট্রানজিট, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে। পাশাপাশি ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকায় এর নবায়নের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্র আরও জানিয়েছে, দিল্লি শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের দ্রুত প্রত্যর্পণে প্রস্তুত থাকার বার্তা ঢাকাকে দিয়েছে। ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ বিভিন্ন ইস্যু সম্ভাব্য সফরের সময়সূচি ও চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারতের দ্য ট্রিবিউনও জানিয়েছে, দিল্লিতে শেখ হাসিনার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগকে জটিল করেছে। তবে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের কৌশলগত প্রয়োজনের কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাকে দিল্লি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে বলেও পত্রিকাটি উল্লেখ করেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন বাস্তবতায় তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর গুরুত্বপূর্ণ। দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে সব অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান সম্ভব না হলেও রাজনৈতিক পর্যায়ে সরাসরি আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
দিল্লির কূটনৈতিক সূত্র বলছে, দুই দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ হিসেবে সফরটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তারেক রহমান নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পাবেন। একইভাবে ভারতের প্রত্যাশাও তুলে ধরতে পারবেন মোদি।
ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজের (সিআইআই) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আগামী সোমবার তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসছে। বিএনপি সরকার প্রায় ছয় মাস আগে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি ভারতের কোনো ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের প্রথম বাংলাদেশ সফর।
প্রতিনিধিদলটি সরকারের একাধিক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করবে।
তারেক রহমানের দিল্লি সফরের প্রস্তাবকে ঘিরে ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা চলছে। বিশেষ করে বিরোধী দল এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য সফরের ক্ষেত্রে সরকারকে এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত মে মাস থেকে ভারতসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার উপস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের অসন্তোষ রয়েছে। ৫ আগস্টের মতবিনিময়ের আগেও ভারত সরকারকে শেখ হাসিনা যেন ভারতের মাটি ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারেন, সে বিষয়ে অনুরোধ জানিয়েছিল ঢাকা। ৩ আগস্ট ভারত আশ্বাস দেওয়ার পরও শেখ হাসিনার ওই মতবিনিময়ের সুযোগ পাওয়ায় বাংলাদেশ সন্তুষ্ট নয় বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে যোগাযোগ চালিয়ে যেতে দুই দেশই আগ্রহী। আগামী দু-এক দিনে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনারের রাজনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ ও আলোচনাগুলো তাই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব তৎপরতা তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর এবং সফরের প্রস্তুতি নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দিতে পারে।
