কৃষিতে আগাছানাশক হিসেবে ব্যবহৃত অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক প্যারাকোয়াট বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। ২০১৩ সালে দেশে প্যারাকোয়াট পান করে বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর একটি ঘটনা নথিভুক্ত হলেও ২০২৪ সালে একই কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১২-তে। গবেষকেরা ১২ বছরে দেশের ১০টি হাসপাতাল থেকে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ১ হাজার ৪২০টি ঘটনা শনাক্ত করেছেন।
গত মে মাসে American Society of Tropical Medicine and Hygiene সাময়িকীতে ‘Clinical and Laboratory Profile of Paraquat Poisoning: A Toxicological Crisis in Bangladesh’ শিরোনামে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। এতে ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের ১০টি হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব হাসপাতাল দেশের ৬৫ শতাংশের বেশি জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসাসেবা দেয় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. ফজলে রাব্বি চৌধুরী। ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার গবেষকেরা এতে অংশ নেন। গবেষকদের দাবি, বাংলাদেশে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়া নিয়ে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় গবেষণা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ৫৩ টনের বেশি প্যারাকোয়াট আমদানি হয়েছিল। ২০২৩ সালে সেই পরিমাণ বেড়ে ৪ হাজার ৬৯৫ টনে পৌঁছায়।
কৃষি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, গ্রামাঞ্চলে কৃষিশ্রমিকের সংকট ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় আগাছা পরিষ্কারে কৃষকেরা হাতের কাজের পরিবর্তে রাসায়নিকের ওপর বেশি নির্ভর করছেন। এর ফলে প্যারাকোয়াটের ব্যবহারও বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বের ৭৭টি দেশে রাসায়নিকটি নিষিদ্ধ।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১০ থেকে ২০ মিলিলিটার প্যারাকোয়াট শরীরে গেলে ফুসফুস ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে পালমোনারি ফাইব্রোসিস তৈরি হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি কয়েক সপ্তাহ ধরে তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে মৃত্যুবরণ করতে পারেন। তীব্র কিডনি বৈকল্য, পা ফুলে যাওয়া, ঘন ঘন বমি ও পেটব্যথা বিষক্রিয়ার প্রধান উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে।
২০১৩ সালে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ায় একটি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হলেও ২০২৪ সালে ৪৯৩টি বিষক্রিয়ার ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। গবেষকেরা এ পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের জন্য একটি ‘বিষবৈজ্ঞানিক সংকট’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার শিকার ব্যক্তিদের ৭৮ দশমিক ২ শতাংশের বয়স ১২ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। আক্রান্তদের মধ্যে শিক্ষার্থী ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ, গৃহিণী ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং কৃষক ১৪ শতাংশ।
টক্সিকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের (টিএসবি) সভাপতি ও গবেষণার অন্যতম লেখক অধ্যাপক মো. আবুল ফয়েজ বলেন, গবেষণায় প্যারাকোয়াটের মারাত্মক ক্ষতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর মতে, এটি নিষিদ্ধ করার বিষয়টি সরকারের জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনা করা উচিত।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, শুধু প্যারাকোয়াট নয়, এ ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিকের ক্ষতির মাত্রা যাচাই করতে পেশাজীবী ও গবেষকদের নিয়ে একটি কমিটি করা হয়েছে। আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া যেতে পারে। ক্ষতিকর প্রমাণিত হলে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির কারণে বিশ্বের ৭৭টির বেশি দেশে প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ রয়েছে। ভারতে কেন্দ্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ না হলেও তেলেঙ্গানাসহ কয়েকটি রাজ্যে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদালত ইউরোপে প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দেয়। অন্যদিকে, দ্য গার্ডিয়ান-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ায় প্যারাকোয়াট পুরোপুরি নিষিদ্ধ না হলেও এর ব্যবহারসংক্রান্ত বিধিনিষেধ কঠোর করা হয়েছে। দেশটির বিজ্ঞানীদের গবেষণায় প্যারাকোয়াটের সংস্পর্শে পারকিনসন্স রোগের ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
গবেষণার প্রধান লেখক ডা. ফজলে রাব্বি চৌধুরীর ভাষ্য, প্যারাকোয়াট ব্যবহারের সঙ্গে পারকিনসন্স ডিজিজ ও বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের যোগসূত্রের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে এর ব্যবহার বড় জনগোষ্ঠীকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ২০০০ সালে ‘ডব্লিউএইচও ক্লাস-১’ভুক্ত অত্যন্ত বিপজ্জনক কীটনাশক নিষিদ্ধ করেছিল। কৃষক ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া ওই সিদ্ধান্ত আত্মহত্যার হার কমাতে ভূমিকা রেখেছিল এবং কৃষি উৎপাদনেও বিরূপ প্রভাব পড়েনি।
ডা. ফজলে রাব্বি চৌধুরী জানান, প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিডোট বা প্রতিষেধক নেই। বর্তমানে পাকস্থলী পরিষ্কার করা, স্টেরয়েড, সাইক্লোফসফামাইড, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, হেমোডায়ালাইসিস ও হেমোপারফিউশনের মতো চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে এসব চিকিৎসার কার্যকারিতা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক গোপাল দাশের নেতৃত্বে ২০২৫ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেশের নিবন্ধিত ৩৪৩টি সক্রিয় কীটনাশক উপাদান বিশ্লেষণ করে ২৫টি উচ্চ ঝুঁকির কীটনাশক শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে ১১টি কীটনাশক, ৭টি ছত্রাকনাশক, ৫টি আগাছানাশক ও ২টি ইঁদুরনাশক রয়েছে।
অধ্যাপক গোপাল দাশ বলেন, উচ্চ ঝুঁকির এসব রাসায়নিকের মধ্যে কোনোটি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হলে প্যারাকোয়াটকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক রমিজ উদ্দিন জানান, প্যারাকোয়াটের বিকল্প রয়েছে। ইন্টিগ্রেটেড উইড ম্যানেজমেন্ট, যান্ত্রিকভাবে আগাছা দমন এবং ইমাজাপাইর, কারফেনট্রাজোন-ইথাইল ও ডিকাম্বারের মতো তুলনামূলক কম বিষাক্ত আগাছানাশক ব্যবহার করা যেতে পারে।
একসময় মূলত চা-বাগানের আগাছা দমনে প্যারাকোয়াট আমদানি করা হলেও বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কৃষি এলাকায় এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছে। সমতলের কৃষিজমির পাশাপাশি পাহাড়ি এলাকার জুমচাষেও এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
সম্প্রতি খাগড়াছড়ির দীঘিনালার দুর্গম সীমানাছড়ি এলাকায় জুমচাষি বনেরঞ্জন ত্রিপুরার সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনে প্যারাকোয়াট ব্যবহারের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জানান, জুমচাষে এখন আগাছানাশকসহ বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। প্যারাকোয়াট দ্রুত আগাছা পরিষ্কার করে বলে তিনি জানেন, তবে এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে তাঁর জানা নেই।
অধ্যাপক রমিজ উদ্দিনের ভাষ্য, দেশে প্যারাকোয়াটের অপব্যবহার হচ্ছে এবং এর আমদানিও ব্যাপক। তবে আগাছা দমনে এর বিকল্প পদ্ধতি ও তুলনামূলক কম বিষাক্ত উপাদান ব্যবহার সম্ভব।
