তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে মিসর ভবিষ্যতে যুক্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। একই সঙ্গে চুক্তিটির পরিধি আরও বাড়িয়ে অন্যান্য দেশকেও এতে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
আল-জাজিরা আরবির ‘আল মুকাবালা’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি রোববার প্রচারের কথা রয়েছে।
এরদোয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তির আওতাভুক্ত কোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে অন্য দুই দেশও সেটিকে নিজেদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেবে। তাঁর মতে, এই ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেন। চুক্তিটি ‘মক্কা চুক্তি’ নামেও পরিচিত।
চুক্তির পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অনেক বিশ্লেষক ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করছেন। ন্যাটোর ওই ধারায় কোনো সদস্যদেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি রয়েছে।
তবে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন, নতুন এই চুক্তিকে ন্যাটোর সমতুল্য সামরিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে এই চুক্তি করা হয়েছে—এমন ধারণাও তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সাক্ষাৎকারে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংকট নিয়েও কথা বলেন এরদোয়ান। তিনি বলেন, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার সময়ে তুরস্ক তার প্রতিবেশী দেশগুলোকে একা ছেড়ে দেবে না। বিশেষ করে সিরিয়া, গাজা ও লেবাননের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন তিনি।
সিরিয়ায় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় তুরস্ক প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে জানান এরদোয়ান। সিরিয়া সফরের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, দেশটির কুর্দি জনগোষ্ঠীও শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। কুর্দিদের অধিকার রক্ষায় তুরস্ক কাজ চালিয়ে যাবে বলেও জানান তিনি।
গাজা প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, তুরস্ক গাজাকে একা ছেড়ে দিতে পারে না। সেখানকার মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রাখার কথা জানান তিনি। হামাস নিজেদের প্রতিশ্রুতি আন্তরিকভাবে বাস্তবায়ন করছে বলেও মন্তব্য করেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। তাঁর অভিযোগ, এরপরও ইসরায়েল যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
লেবাননে ইসরায়েলের হামলা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এরদোয়ান। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে লেবাননে সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরেছেন বলে জানান তিনি।
সুদানের প্রতিও তুরস্কের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে জানান এরদোয়ান। দেশটির সার্বভৌম কাউন্সিলের প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো বলেও উল্লেখ করেন তিনি। লিবিয়ার ক্ষেত্রেও আঙ্কারা সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে জানান তুর্কি প্রেসিডেন্ট।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার প্রসঙ্গও উঠে আসে সাক্ষাৎকারে। এরদোয়ান বলেন, প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়াকে তুরস্ক অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তাঁর মতে, হরমুজ বন্ধ থাকা কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণকর নয়।
আঞ্চলিক সংঘাত নিরসনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় কাতারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে তুরস্কের সদস্যপদ নিয়েও কথা বলেন এরদোয়ান। তিনি বলেন, তুরস্ককে সদস্য করার বিষয়ে ইইউর আগ্রহ নেই বলেই মনে হচ্ছে। ফলে বর্তমানে সদস্যপদ অর্জন আঙ্কারার অগ্রাধিকার নয়। তবে তুরস্ককে সদস্য না করলে শেষ পর্যন্ত ইউরোপই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পাওয়ার বিষয়েও কথা বলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। তাঁর দাবি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এফ-৩৫ সরবরাহের বিষয়ে তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
২০১৯ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার পর তুরস্ককে এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বাদ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা ছিল, রুশ এস-৪০০ ব্যবস্থার কারণে এফ-৩৫-এর সংবেদনশীল প্রযুক্তি নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়তে পারে।
পরে ন্যাটো সম্মেলনে এরদোয়ানের পাশে থাকা ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, এস-৪০০ কেনার কারণে তুরস্কের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তুরস্ককে আবার এফ-৩৫ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেছিলেন।
