ভারত সম্পর্কে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ৩৬ দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর চালানো জরিপে গড়ে ৪৫ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানিয়েছেন। বিপরীতে ৪১ শতাংশের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক। বাংলাদেশে অবশ্য ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের হার আগের জরিপের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমেছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার এ জরিপ পরিচালনা করে। চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের মতামত নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তুলনামূলক বেশি। ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশেও নেতিবাচক মনোভাব বাড়ছে।
অন্যদিকে আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ভারত সম্পর্কে মানুষের মনোভাব মোটের ওপর ইতিবাচক। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর অবস্থান অবশ্য এক নয়। শ্রীলঙ্কায় ভারতের প্রতি ব্যাপক ইতিবাচক মনোভাব থাকলেও পাকিস্তানে চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। বাংলাদেশেও অর্ধেকের বেশি মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক নন।
যুক্তরাষ্ট্রে জরিপে অংশ নেওয়া ৫০ শতাংশ মানুষের ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। কানাডায় এ হার ৪০ শতাংশ। বিপরীতে কানাডার ৫১ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫ শতাংশ মানুষ ভারতের বিষয়ে ইতিবাচক মত দিয়েছেন।
পিউ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ২০০৮ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৩ সালে ৫১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ভারত সম্পর্কে ইতিবাচক মত জানিয়েছিলেন। এরপর এ হার দ্রুত কমেছে।
রাজনৈতিক মতাদর্শের ক্ষেত্রেও পার্থক্য দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান ও রিপাবলিকানপন্থীদের তুলনায় ডেমোক্র্যাট ও ডেমোক্র্যাট-সমর্থক স্বতন্ত্রদের ভারতের প্রতি ইতিবাচক হওয়ার প্রবণতা বেশি। বয়সের ক্ষেত্রেও পার্থক্য রয়েছে। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বেশি হলেও ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এ হার ৪২ শতাংশ।
ভারতের বৈশ্বিক প্রভাব নিয়েও মার্কিন নাগরিকদের মতামত নেওয়া হয়। ৫৪ শতাংশ মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের প্রভাব প্রায় একই রয়েছে। ৩০ শতাংশের মতে, ভারতের বৈশ্বিক প্রভাব বেড়েছে। আর ১৩ শতাংশ মনে করেন, ভারতের প্রভাব কমেছে।
বাংলাদেশে জরিপে অংশ নেওয়া ৫১ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেননি। বিপরীতে ৪২ শতাংশ ভারতের বিষয়ে ইতিবাচক মত দিয়েছেন।
পিউ রিসার্চ জানিয়েছে, বাংলাদেশে এর আগে সর্বশেষ ২০২৪ সালে এ ধরনের জরিপ করা হয়েছিল। সেই জরিপের তুলনায় এবার ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের হার ১৫ শতাংশ কমেছে। ২০২৪ সালের জরিপে ২৪ শতাংশ উত্তরদাতা ভারতের বিষয়ে কোনো মত দিতে চাননি। এবার সেই হার কমে ৭ শতাংশ হয়েছে।
ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব সবচেয়ে বেশি। জরিপে অংশ নেওয়া ৭১ শতাংশ ব্রিটিশ ভারত সম্পর্কে ইতিবাচক মত দিয়েছেন। নেতিবাচক মত দিয়েছেন ২৪ শতাংশ।
জার্মানিতে ৬৩ শতাংশ, ইতালিতে ৫৬ শতাংশ, সুইডেনে ৫৫ শতাংশ, ফ্রান্সে ৫০ শতাংশ, নেদারল্যান্ডসে ৪৯ শতাংশ, হাঙ্গেরিতে ৪০ শতাংশ, গ্রিসে ৩৯ শতাংশ এবং পোল্যান্ড ও স্পেনে ৩৭ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানিয়েছেন।
ইসরায়েলে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে ৬০ শতাংশ মানুষের। ২৯ শতাংশের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক। তবে অধিকৃত পশ্চিম তীর বা পূর্ব জেরুজালেমের বাসিন্দাদের মধ্যে মাত্র ১৮ শতাংশ ভারত সম্পর্কে ইতিবাচক মত দিয়েছেন।
তুরস্কে ভারতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বেশ প্রবল। দেশটির ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা ভারতের বিষয়ে নেতিবাচক মত দিয়েছেন। ইতিবাচক মত দিয়েছেন মাত্র ১৫ শতাংশ।
দক্ষিণ আফ্রিকায় ৩৮ শতাংশ মানুষের ভারত সম্পর্কে ইতিবাচক এবং ৪৬ শতাংশের নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। কেনিয়ায় ৭১ শতাংশ, ঘানায় ৫০ শতাংশ এবং নাইজেরিয়ায় ৪৭ শতাংশ উত্তরদাতা ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানিয়েছেন।
লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিলের ৩৭ শতাংশ, কলম্বিয়ার ৩৬ শতাংশ, মেক্সিকোর ৩০ শতাংশ, পেরুর ২৯ শতাংশ, চিলির ২৫ শতাংশ এবং আর্জেন্টিনার ২৪ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
জাপান ও থাইল্যান্ডে জরিপে অংশ নেওয়া ৫৫ শতাংশ মানুষের ভারত সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। সিঙ্গাপুরে এ হার ৫১ শতাংশ।
এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ায় ৫০ শতাংশ, ফিলিপাইনে ৪৯ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪৪ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ৪৪ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় ৪১ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানিয়েছেন।
দক্ষিণ এশিয়ার তিন প্রতিবেশী দেশে ভারতের বিষয়ে মানুষের মনোভাব জরিপে উঠে এসেছে—পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ।
ভারত-পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের প্রতিফলন জরিপের ফলেও দেখা গেছে। পাকিস্তানে মাত্র ৭ শতাংশ উত্তরদাতা ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন। বিপরীতে ৯১ শতাংশের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক।
শ্রীলঙ্কায় পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। দেশটির ৭৯ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের কথা বলেছেন। নেতিবাচক মত দিয়েছেন ১১ শতাংশ। ২০২৪ সালে শ্রীলঙ্কায় ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ছিল ৬৫ শতাংশ।
পিউ রিসার্চ বলেছে, কয়েকটি দেশে রাজনৈতিক মতাদর্শ ভারতের বিষয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ডানপন্থীদের তুলনায় বামপন্থীদের মধ্যে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রে ৫৪ শতাংশ উদারপন্থী এবং ৪০ শতাংশ রক্ষণশীল উত্তরদাতা ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন। কানাডায় বামপন্থীদের মধ্যে এ হার ৫৮ শতাংশ, আর ডানপন্থীদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ।
ইসরায়েলে অবশ্য চিত্র ভিন্ন। সেখানে ৪৬ শতাংশ বামপন্থী ভারত সম্পর্কে ইতিবাচক মত দিয়েছেন। ডানপন্থীদের মধ্যে এ হার ৬৮ শতাংশ।
