সার, কীটনাশক, খইল, সেচ, বাঁশ-খুঁটি ও শ্রমিকের মজুরিসহ পান চাষের প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় বাড়েনি পানের বিক্রিমূল্য। ফলে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন রাজশাহীর পানচাষিরা। বর্তমানে ছোট আকারের পান মানভেদে প্রতি বিড়া ১০ থেকে ২৫ টাকা এবং বড় আকারের পান ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। চাষিদের দাবি, এই দামে তাঁদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।
রোববার সকালে রাজশাহীর মোহনপুরের মৌগাছি পান হাটে গিয়ে চাষিদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া যায়। মোহনপুরের পানচাষি মো. এরশাদ বলেন, বরজে পান রেখে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রতি বিড়া অন্তত ১৫ টাকা পাওয়ার আশা করলেও ১০ টাকা দাম বলা হচ্ছে। এক বিঘা জমিতে পান চাষ করে বর্তমানে তিনি বড় ধরনের লোকসানে রয়েছেন। পান বিক্রির আয় দিয়ে সংসারের খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
চাষিরা জানান, পানের বাজারদর উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সার, কীটনাশক ও খইলের পাশাপাশি সেচ, বরজ তৈরির বাঁশ-খুঁটি এবং শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুর ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে হাটে পানের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি।
রাজশাহীর বাজারে সাধারণত বিড়া ও পোয়া হিসাবে পান বিক্রি হয়। এক বিড়ায় ৬৪টি পান থাকে এবং ৩২ বিড়ায় এক পোয়া।
পানচাষি মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, প্রতি বিড়া ৩৫ টাকা দামে বিক্রি করতে পারলে কোনোভাবে উৎপাদন খরচ ওঠে। অথচ বর্তমানে তার এক-তৃতীয়াংশের মতো দাম পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘লাভ তো দূরের কথা, শুধু হাতে নগদ টাকা পাওয়ার জন্য পান বিক্রি করতে হচ্ছে।’
মোহনপুরের আরেক চাষি মো. সোহেল রানা হাটে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দর-কষাকষি করেও পান বিক্রি করেননি। তাঁর হিসাবে, এক বিঘা জমিতে বরজ তৈরি ও পানগাছের চারা লাগাতেই প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় হয়। পরে সারা বছর পরিচর্যা, সার ও কীটনাশকের পেছনে আরও প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়। অর্থাৎ বছরে মোট ব্যয় প্রায় দুই লাখ টাকা হলেও বর্তমানে এক লাখ টাকার পান বিক্রি করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
চাষিদের কয়েকজন জানান, বরজ তৈরির বাঁশসহ অন্যান্য উপকরণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাঁদের মতে, প্রতি বিড়া পান অন্তত ৮০ টাকা দামে বিক্রি হলে চাষিরা কিছুটা স্বস্তি পেতেন।
মৌগাছি পান হাট বসে ফজরের নামাজের পর এবং সকাল নয়টা পর্যন্ত চলে। ভোরে বিভিন্ন এলাকা থেকে চাষিরা পান নিয়ে হাটে আসেন। হাটের ভেতরে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অনেককে রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের দুই পাশেও বসতে দেখা যায়। হাঁকডাকে চলে পান কেনাবেচা। পানের পাশাপাশি হাটে সুপারি বিক্রিও হয়।
মোহনপুরের ত্রিমোহনী এলাকার চাষি মো. ইয়ামিন আলী ১০ কাঠা জমিতে পান চাষ করেন। তিনি বলেন, বরজের পরিচর্যায় বছরে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। খইল, সার, কীটনাশক ও সেচেও বড় অঙ্কের অর্থ খরচ হয়। অথচ বর্তমানে প্রতি বিড়া পান ২০ টাকা দামে কেনার কথা বলা হচ্ছে। তাঁর মতে, প্রতি বিড়া অন্তত ৫০ টাকা না পেলে পান চাষ ধরে রাখা কঠিন।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, পানের দাম মূলত বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। পঞ্চগড়ে পান সরবরাহকারী আড়তদার মো. মাইনুল ইসলাম বলেন, কোনো দিন হাটে বেশি পান এলে দাম কমে যায়। আবার সরবরাহ কম থাকলে দাম বেড়ে যায়।
ব্যবসায়ী মো. তজিবর জানান, পানের মান ও মৌসুমের ওপরও দাম পরিবর্তিত হয়। তাঁরা ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পান পাঠান। মোহনপুরের ব্যবসায়ী তৈবুর রহমানও বলেন, চাহিদা ও সরবরাহের পরিবর্তনের কারণে পানের দামে ওঠানামা হয়।
চাষিদের আশা, আগামী দুই মাসের মধ্যে পানের দাম বাড়তে পারে। তাঁদের হিসাবে, বর্তমানে একটি পানগাছে ১৫ থেকে ১৬টি পাতা থাকলেও কিছুদিন পর তা কমে ছয় থেকে সাতটিতে নেমে আসবে। একই সময়ে অনেক বরজ পচে বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ফলে বাজারে সরবরাহ কমলে দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দুর্গাপুরের চাষি মিজানুর বলেন, কার্তিক থেকে চৈত্র পর্যন্ত শীত মৌসুমে পানের উৎপাদন কমে গেলে প্রতি বিড়ার দাম ৮০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে। তবে বছরের অন্য সময়ে কম দামে পান বিক্রি করে যে ক্ষতি হয়, মৌসুমে বেশি দাম পেলেও তা পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় ৫ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে পান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৮৬ হাজার ৮২৪ মেট্রিক টন।
গত বছর রাজশাহীর নয়টি উপজেলায় ৪ হাজার ৫০৯ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়েছিল। ওই বছর উৎপাদন হয়েছিল ৭৯ হাজার ৬৮১ মেট্রিক টন।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, বর্ষা মৌসুমে পানের উৎপাদন বেশি থাকায় এ সময়ে দাম কিছুটা কম থাকে। তবে বছরের অন্য মৌসুমে কৃষকেরা তুলনামূলক ভালো দাম পান।
