কক্সবাজারের প্রবালসমৃদ্ধ সেন্ট মার্টিন দ্বীপের বিভিন্ন সৈকতে রাতের অন্ধকারে কেয়াবনে আগুন দিয়ে গাছ ধ্বংসের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, হোটেল-রিসোর্ট থেকে সমুদ্রের দৃশ্য সরাসরি দেখানোর সুযোগ তৈরি করে ব্যবসা বাড়াতেই প্রভাবশালী একটি চক্র এ কাজ করছে। এতে দ্বীপের বালিয়াড়ি ক্ষয়, জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকারের প্রায় ৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার প্রকল্পে নতুন করে কেয়াবন সৃষ্টির উদ্যোগ চললেও পাশাপাশি পুরোনো বন ধ্বংসের ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে।
৮ আগস্ট সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পূর্বপাড়ার সৈকতে গিয়ে দেখা যায়, সরু ইটের রাস্তা ও সৈকতের মাঝখানে থাকা কেয়াগাছের সারির একটি বড় অংশ আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে ওই জায়গা দিয়ে সমুদ্রের দৃশ্য সরাসরি দেখা যাচ্ছে। শুধু পূর্বপাড়া নয়, গলাচিপা, দক্ষিণপাড়া, কোনারপাড়া ও উত্তরপাড়াতেও কেয়াবন ধ্বংসের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
বড় ঢেউ ও ঝোড়ো বাতাসের আঘাত থেকে সৈকতের বালিয়াড়িকে সুরক্ষা দেওয়া কেয়াবন ধ্বংসের এ ঘটনা এমন সময়ে ঘটছে, যখন দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের আওতায় উন্মুক্ত সৈকত ও বালিয়াড়িতে নতুন করে কেয়াগাছের চারা লাগানো হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেন্ট মার্টিন দ্বীপের আয়তন ১৩ বর্গকিলোমিটার। তবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসাবে আয়তন প্রায় ৯ বর্গকিলোমিটার। জোয়ার-ভাটার কারণে আয়তনে কিছুটা পরিবর্তন হয়। স্থানভেদে দ্বীপটির প্রস্থ আধা কিলোমিটার থেকে দেড় কিলোমিটার। একসময় দ্বীপের চারপাশ ও বিভিন্ন অংশে বিস্তৃত কেয়াবন ছিল। পর্যটনের জন্য হোটেল-মোটেল নির্মাণসহ বিভিন্ন কারণে সেই বন অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
‘সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন প্রকল্প’-এর আওতায় ৮ কোটি ৯০ লাখ ২৫ হাজার টাকা ব্যয়ে কাজ চলছে। পরিবেশ অধিদপ্তর বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পে কেয়াবনের পরিমাণ বাড়াতে নতুন করে চারা রোপণ করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে সৈকত ও বালিয়াড়িতে ২ হাজার ৫০০ কেয়া চারা লাগানো হয়েছে। আরও ৩ হাজার চারা রোপণের কাজ চলছে।
প্রকল্প পরিচালক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে বালিয়াড়ি রক্ষায় কেয়াবনই দ্বীপের প্রধান প্রাকৃতিক ঢাল। এর শিকড় মাটির গভীরে ছড়িয়ে বালুকে শক্তভাবে ধরে রাখে। অতীতে হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণের কারণে কেয়াবন হারিয়ে গেলেও এখন বিলুপ্ত ও অনাবাদি এলাকায় নতুন করে কেয়াবন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
৯ আগস্ট গলাচিপা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একসময় সেখানে ২০ থেকে ২৫ ফুট উঁচু কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ কেয়াবন ছিল। বর্তমানে প্রায় এক কিলোমিটার অংশে কেয়াবন নেই। পাশের প্রায় আধা কিলোমিটার বনাঞ্চলের অন্তত ৩০০ কেয়াগাছ আগুনে ধ্বংস হয়েছে। সেখানে শতাধিক পোড়া ও কঙ্কালসার গাছ দাঁড়িয়ে আছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, রাতের বেলায় কয়েকজন ব্যক্তি কেয়াবনে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক গাছ পুড়ে যায়। দক্ষিণপাড়া, দিয়ারমাথা, পশ্চিমপাড়া ও কোনারপাড়া সৈকতেও একই ধরনের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও পরিবেশবিশেষজ্ঞদের মতে, কেয়াবন সেন্ট মার্টিনের জন্য একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এর শিকড় বালু আটকে রাখায় সৈকত ও বালিয়াড়ি স্থিতিশীল থাকে। বন কমে যাওয়ায় বালিয়াড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং জোয়ারের পানি আগের তুলনায় সরাসরি বসতবাড়ির দিকে পৌঁছাচ্ছে।
এ ছাড়া কেয়াবন বহু পাখি, গিরগিটি ও সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। বন ধ্বংসের কারণে এসব প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়ও সংকুচিত হচ্ছে।
২০২৩ সালের ৫ জানুয়ারি ‘সেন্ট মার্টিনে উজাড় হচ্ছে কেয়াবন, জেনেও চুপ প্রশাসন’ শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পর কেয়াবন ধ্বংসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। পরিবেশ অধিদপ্তর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে। তবে এরপরও কেয়াবন পুড়িয়ে ধ্বংসের ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, পূর্ব সৈকতসহ বিভিন্ন এলাকায় হোটেল-রিসোর্ট ও গেস্টহাউস থেকে সমুদ্রের দৃশ্য দেখানোর সুযোগ তৈরি করতে রাতের আঁধারে কেয়াবনে আগুন দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, কেয়াবন সংরক্ষণের দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের।
সেন্ট মার্টিন পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, কেয়াবনে আগুন দেওয়া বা গাছ কাটার ঘটনা ঘটলেও পুলিশ সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারে না। পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা করলে পুলিশ আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, জনবলসংকট এবং বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকার কারণে অনেক সময় কর্মকর্তাদের সেন্ট মার্টিনে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে কেয়াগাছ কাটা ও সৈকত দখলের অভিযোগে ইতিমধ্যে ১৪টি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। কেফায়েত উল্লাহ নামের এক রিসোর্টমালিকের বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে।
তিনি জানান, আগামী ১ নভেম্বর পর্যটন মৌসুম শুরু হলে ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন দিয়ে কেয়াবন ধ্বংসে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ বা ইসিএ ঘোষণা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। পরে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সেন্ট মার্টিনসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়।
ইসিএ আইন অনুযায়ী, সেন্ট মার্টিনে মাটির পরিবর্তন, অবকাঠামো নির্মাণ, কেয়াবন ধ্বংস, গাছ ও ফল কাটা, প্রবাল-পাথর উত্তোলন এবং পরিবেশদূষণকারী বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ। আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
তবে এসব বিধিনিষেধের মধ্যেও দ্বীপে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার পর্যটক চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি—এই তিন মাস প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন যেতে পারেন। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে রাতযাপনের সুযোগ থাকলেও নভেম্বরে পর্যটকদের দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসতে হয়।
গত আড়াই বছরে দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় ৮০টির বেশি অবৈধ রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নজর এড়িয়ে এসব স্থাপনার বেশির ভাগই পাকা কাঠামোয় নির্মাণ করা হয়েছে।
সেন্ট মার্টিনের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন, কেয়াবন ধ্বংসের ফলে সৈকতের বালিয়াড়ি ধসে যাচ্ছে। নারকেলগাছের গোড়ার মাটি সরে গিয়ে গাছ উপড়ে পড়ছে এবং জোয়ারের পানি সরাসরি বসতবাড়িতে আঘাত করছে। তাঁর দাবি, দ্বীপের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৮ কিলোমিটার কেয়াবনের কিছু অংশও ধ্বংস করা হচ্ছে। বাইরের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জমি কিনে প্রথমে গাছ পুড়িয়ে বা কেটে সেখানে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করছেন।
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান বলেন, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কেয়াবন দ্বীপের মানুষ ও প্রকৃতিকে সুরক্ষা দিত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দ্বীপে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৬ হাজার নারকেলগাছও এখন অস্তিত্বের সংকটে। এক দশক আগে এই সংখ্যা ছিল প্রায় দ্বিগুণ।
গত দুই মৌসুমে ২ লাখ ৩৭ হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করেছেন, যা তিন বছর আগের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। পর্যটক কমায় পরিবেশের কিছুটা উন্নতি হলেও কেয়াবন রক্ষা করা যাচ্ছে না বলে স্থানীয়দের বক্তব্য।
৮ আগস্ট সেন্ট মার্টিন সফরের সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম কেয়াবন পুড়িয়ে ধ্বংস এবং অবৈধভাবে হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এসব বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে তিনি পরিবেশ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন।
