রাজশাহীর বাগমারার ফিরোজুল ইসলাম ফিরোজ একসময় অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কয়েক বছরের ব্যবধানে তার জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। গড়ে উঠেছে ডুপ্লেক্স বাড়ি, ব্যবহার করছেন বিলাসবহুল গাড়ি এবং রয়েছে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা ও এনজিও। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের আশ্রয় ও সাংগঠনিক তৎপরতায় তার ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বাগমারায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন, পলাতক নেতাকর্মীদের আশ্রয় দেওয়া এবং গোপন বৈঠক আয়োজনের সঙ্গে ফিরোজ জড়িত। এ কারণে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের নেপথ্যে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন কি না।
সূত্রের তথ্যানুযায়ী, রাজশাহী জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতার দিকনির্দেশনায় ফিরোজ সাংগঠনিক তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাগমারার পাশাপাশি সাভারে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেখানেও পলাতক নেতাকর্মীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগের তহবিলের অর্থও তার কাছে আসছে বলে দাবি করা হয়েছে।
গত ১২ আগস্ট ফিরোজের মালিকানাধীন ‘বাগমারা সবুজ বাংলা লি.’ নামে একটি এনজিও কার্যালয়ে বৈঠক চলাকালে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই বৈঠকে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন তাহেরপুর পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা, রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জাকিরুল ইসলাম সান্টুর ব্যক্তিগত সহকারী সাজেদুর রহমান, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত শহিদুল ইসলাম শহিদ, সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদের সহযোগী আমজাদ হোসেন এবং ছাত্রলীগকর্মী রেজোয়ান ও রাসেল।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, ফিরোজ বর্তমানে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের অন্যতম আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা। তাদের ভাষ্য, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে তার সম্পদের পরিমাণ ও জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এলাকায় ডুপ্লেক্স বাড়ি এবং দুটি বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ফিরোজ এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পরে সাভারে বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেখানে নিজে থাকার পাশাপাশি বাগমারা থেকে পালিয়ে যাওয়া নেতাকর্মীদের আশ্রয় দেন বলে অভিযোগ ওঠে। কয়েক মাস পর এলাকায় ফিরে তিনি আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
বর্তমানে ফিরোজের সঙ্গে সাংগঠনিক তৎপরতায় কয়েকজন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা রয়েছেন বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ঝিকরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রফিক, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মানিক হোসেন, উপজেলা যুবলীগের সভাপতি মোশাররফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক জলিল মাস্টার, ভবানীগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র মালেক মণ্ডল এবং তাহেরপুর পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানার নাম রয়েছে।
ফিরোজ ঝিকড়া ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে তিনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন এবং নিজের ফেসবুক আইডি থেকে সাংগঠনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি নির্বাচনি প্রচারণা চালাচ্ছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে কয়েকটি ফেসবুক পেজ চালু করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর মধ্যে ‘বাগমারা উপজেলা যুবলীগ’ নামের একটি পেজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেটি যুবলীগ নেতা সোহেল রানা নিয়ন্ত্রণ করেন বলে দাবি করা হয়েছে। ওই পেজ থেকে আওয়ামী লীগের পক্ষে এবং সরকারবিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
ফিরোজের গ্রেফতারের বিষয়ে বাগমারা থানার ওসি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ১২ আগস্ট গোপন বৈঠক চলাকালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ২৪ জুলাই ভবানীগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িতে ককটেল হামলার ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে পুলিশ দাবি করেছে। ওই মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তার সহযোগীদের মধ্যে যারা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করছেন, তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।
তবে ফিরোজের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগও করেছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও ঝিকরা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুজ্জামান রতন। তিনি ফিরোজকে ক্যাসিনো ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেন এবং তার সম্পদের বিষয়ে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে সাংগঠনিক তৎপরতা চালানোর অভিযোগও করেন তিনি।
ফিরোজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। তবে পুলিশ বলছে, তাকে একটি ককটেল হামলার মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে অভিযান চলছে।
