কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার জমির উদ্দিনের বাগান এখন তাঁর আয়ের প্রধান উৎস। কৃষিতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকলেও ইউটিউব ও গুগল থেকে বিভিন্ন পদ্ধতি শিখে তিনি চার একর জমিতে গড়ে তুলেছেন মিশ্র ফলের বাগান। গত বছর প্রথমবার ফলন পেয়েই প্রায় ২২ লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছেন তিনি।
জমির উদ্দিনের বয়স ৪৫ বছর। তিনি পেকুয়ার টৈটং ইউনিয়নের সোনাইছড়ি এলাকার বাসিন্দা। রমিজপাড়ায় তাঁর বাগানটি অবস্থিত। আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক থেকে পূর্ব দিকে পাহাড়ি ছড়া ধরে প্রায় এক কিলোমিটার গেলে চারপাশে পাহাড়ঘেরা বাগানটির দেখা মেলে।
২০২৩ সালে চার একর জমি লাগিয়ত নিয়ে মিশ্র ফলের বাগান শুরু করেন জমির উদ্দিন। বর্তমানে সেখানে ১ হাজার ৪০০টি পেয়ারা, ৭৮০টি বারি-১ মাল্টা, ২০টি বারোমাসি মাল্টা, ২৫০টি জাম্বুরা এবং ২৫০টি দার্জিলিং কমলার গাছ রয়েছে। এসব চারা তিনি নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করেছেন।
বাগানে গাছের পরিচর্যা ও আগাছা পরিষ্কারের কাজ করেন শ্রমিকেরা। ফলকে পোকামাকড় ও রোগবালাই থেকে রক্ষায় কোনো কোনো ফল পলিথিনে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে।
জমি লাগিয়ত নেওয়া, জমি উন্নয়ন, চারা, শ্রমিক, সেচ, সার, কীটনাশক, বেড়া এবং ফল প্যাকেটজাত করার উপকরণসহ দুই বছরে তাঁর ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩২ লাখ টাকা। গত বছর থেকেই বাগানে ফল আসতে শুরু করে। প্রথম বছরেই তিনি প্রায় ২২ লাখ টাকার ফল বিক্রি করেন।
এ বছর ভালো ফলন ও বিক্রির আশা করেছিলেন জমির উদ্দিন। তবে জুলাইয়ের শুরুতে পেকুয়ার বন্যায় তাঁর বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে বাগানটি টানা ছয় দিন ডুবে ছিল। এতে প্রায় ৩৫ হাজার পেয়ারা ও ১০ হাজার মাল্টা ঝরে পড়ে। মারা যায় অন্তত ৭০০টি ফলগাছ। সব মিলিয়ে তাঁর ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা।
তারপরও চলতি মৌসুমে প্রায় ১৭ লাখ টাকার ফল বিক্রির আশা করছেন তিনি। স্থানীয় বাজারে বর্তমানে মাল্টা প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৫০ টাকা এবং পেয়ারা ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের পাইকারেরা তাঁর বাগানে এসে ফল কিনে নিচ্ছেন।
জমির উদ্দিন বলেন, কঠোর পরিশ্রম ও পুঁজি বিনিয়োগ করলে দেশে থেকেই বিদেশের চেয়ে বেশি আয় করা সম্ভব। বন্যায় এ বছর ক্ষতি হলেও ভবিষ্যতে তা পুষিয়ে নেওয়ার আশা করছেন তিনি।
ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ২০০০ সালে সৌদি আরবে যান জমির উদ্দিন। নয় বছর পর দেশে ফিরে প্রসাধনীর দোকান দেন। ব্যবসায় লোকসান হওয়ায় ২০১২ সালে আবার কাতারে যান। ২০১৬ সালে দেশে ফিরে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ব্যবসা শুরু করেন। ভাড়া দেওয়ার জন্য পাঁচটি অটোরিকশা কিনলেও নানা সমস্যায় সেগুলো বিক্রি করে দিতে হয়।
এরপর কৃষিতে মন দেন তিনি। ২০১৮ সালে পাঁচ একর জমিতে পেঁপের বাগান করেন। এক বছর পর পেঁপে চাষে সুবিধা করতে না পেরে ২ হাজার ২৫০টি কলাগাছ লাগান। সেখান থেকে প্রায় আট লাখ টাকা লাভ হলেও পরের মৌসুমে ফলন কমে যায়। পরে কলাগাছ কেটে ফেলেন।
কৃষি না ছেড়ে ২০২৩ সালে বাড়ির পাশে চার একর জমি লাগিয়ত নিয়ে মিশ্র ফলের বাগান শুরু করেন। কৃষির নতুন পদ্ধতি শেখার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিকে কাজে লাগান তিনি। কোনো সমস্যা হলে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি গুগল ও ইউটিউবে কৃষিবিষয়ক ভিডিও দেখেন।
জমির উদ্দিন বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কীভাবে বাগান করা হচ্ছে, তা ইউটিউব থেকে দেখে তিনি শিখেছেন। শুরু করার সাহস থাকলে কাজ করতে করতেই অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।
পেকুয়ার পাহাড়ি এলাকায় মিশ্র ফলের বাগানের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, এ অঞ্চলের মাটি মাল্টা, কমলা, কাজুবাদাম, কফি ও লেবু চাষের জন্য উপযোগী।
কৃষি কর্মকর্তারা জমির উদ্দিনের বাগানের বিশেষত্ব হিসেবে একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ফল চাষের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, কোনো একটি ফলের দাম কমে গেলে অন্য ফলের ভালো দামের মাধ্যমে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে।
পেকুয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফারুক হোসেন চৌধুরী বলেন, পেকুয়ায় বাণিজ্যিকভাবে মাল্টা চাষের বাগান হিসেবে জমির উদ্দিনের বাগানটি ব্যতিক্রম। পাহাড়ি এলাকায় এ ধরনের মিশ্র ফলের বাগানের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি বিভাগ তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে।
