প্রতিবেদন: বিবিসি
চিলির আতাকামা মরুভূমিতে তৈরি হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টেলিস্কোপগুলোর একটি—Extremely Large Telescope (ELT)। ৮০ মিটার উঁচু গম্বুজ ও ৩৯ মিটার প্রশস্ত আয়নাযুক্ত এই বিশাল টেলিস্কোপ মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো দূরবর্তী গ্রহগুলো পর্যবেক্ষণ করে সেখানে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা খুঁজে দেখা।
ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরি (ESO)-এর ১৬ সদস্যরাষ্ট্রের সমন্বয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। টেলিস্কোপটির বাইরের কাঠামো ২০২৭ সালে সম্পন্ন হওয়ার কথা। সংস্থাটি আশা করছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ELT মহাকাশ পর্যবেক্ষণ শুরু করতে পারবে।
চিলির আতাকামা মরুভূমির Cerro Armazones পর্বতের চূড়ায় তৈরি হচ্ছে ELT। অঞ্চলটি অত্যন্ত শুষ্ক ও দুর্গম। কোথাও কোথাও কয়েক শতাব্দীতে মাত্র কয়েকবার বৃষ্টি হয়। নির্মাণসামগ্রীকে নিকটতম শহর থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিবহন করে পাহাড়ের চূড়ায় নিতে হচ্ছে।
টেলিস্কোপটির নির্মাণে ব্যবহার হচ্ছে কয়েক দশ হাজার টন কংক্রিট ও ইস্পাত। বিশাল কাঠামোর পাশাপাশি এর মূল আয়নাটি তৈরি হবে ৭৯৮টি পৃথক ষড়ভুজাকার অংশ দিয়ে।
টেলিস্কোপটির নির্মাণ কতটা জটিল, তা বোঝাতে সাইটের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগের প্রধান মাইকেল বুথ বলেন, এত বড় ও জটিল প্রকল্পে শুধু যন্ত্র চালু করে ফলাফল দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি ধাপেই অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিকল্পনা ও নির্ভুলতা প্রয়োজন।
ELT-এর ৩৯ মিটার প্রশস্ত আয়না বর্তমানে পৃথিবীর কোনো কার্যকর স্থলভিত্তিক অপটিক্যাল-ইনফ্রারেড টেলিস্কোপের আয়নার চেয়ে বড় হবে। তুলনায়, কাছাকাছি থাকা Very Large Telescope (VLT)-এর চারটি টেলিস্কোপের প্রতিটির আয়নার ব্যাস ৮ দশমিক ২ মিটার।
ELT-এর আয়নাটি শুধু বড়ই নয়, বায়ুমণ্ডলের অস্থিরতার প্রভাব মোকাবিলায় এর আকৃতিও বাস্তব সময়ে পরিবর্তন করা যাবে। এর ফলে দূরের মহাজাগতিক বস্তু আরও বেশি স্পষ্টতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
আয়নাটি ৭৯৮টি পৃথক অংশে তৈরি হওয়ায় প্রতিটি অংশের পৃষ্ঠ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রস্তুত করতে হচ্ছে। প্রকৌশলীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আয়নার পৃষ্ঠে সামান্য আঁচড়ও গ্রহণযোগ্য নয়।
বড় আয়নার কারণে ELT দূরের নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি থেকে আসা আরও বেশি আলো সংগ্রহ করতে পারবে। এর ফলে বর্তমানে যেসব মহাজাগতিক বস্তু আলাদা করে দেখা কঠিন, সেগুলো আরও স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী এলিয়ার সেদাঘাতি একটি দূরের গাড়ির দুই হেডলাইটের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। দূর থেকে দুটি আলোকে একটি আলো মনে হতে পারে; কিন্তু গাড়িটি কাছে এলে দুই আলো আলাদা করে দেখা যায়। একইভাবে বড় আয়না দূরের নক্ষত্র ও অন্যান্য বস্তুর আলোকে আরও বিস্তারিতভাবে আলাদা করে পর্যবেক্ষণ করতে সাহায্য করবে।
ELT দূরবর্তী ও প্রাচীন গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে মিল্কিওয়ের সবচেয়ে পুরোনো নক্ষত্রগুলোর বয়স নির্ধারণ এবং গ্যালাক্সির কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকা নক্ষত্রগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেও নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
ELT-এর সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনাগুলোর একটি হলো পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ খোঁজা।
টেলিস্কোপটি কোনো এক্সোপ্ল্যানেটে সরাসরি কোনো প্রাণীকে দেখতে পারবে না। এমনকি সেখানকার স্থলভাগও সরাসরি শনাক্ত করা সম্ভব হবে না। তবে গ্রহটির বৈশিষ্ট্য ও বাসযোগ্যতার সম্ভাবনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা যাবে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো এক্সোপ্ল্যানেট পাথুরে নাকি গ্যাসীয়—তা নির্ধারণে তার নক্ষত্রের গতিতে সৃষ্ট অতি সূক্ষ্ম পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা যায়। এসব পরিবর্তন থেকে গ্রহটির ভর সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। ELT অপেক্ষাকৃত কম ভরের ছোট গ্রহগুলোর ভরও পরিমাপ করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা রয়েছে—এমন গ্রহের সংখ্যা বাড়তে পারে।
কোনো এক্সোপ্ল্যানেটের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করেও প্রাণের সম্ভাবনা খোঁজা যেতে পারে। কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে নক্ষত্রের আলো পৃথিবীর দিকে আসার সময় সেই আলোর বর্ণালীতে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের নিজস্ব চিহ্ন তৈরি হয়।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী মারিয়া লিউবেনোভা এই চিহ্নকে আঙুলের ছাপের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কোনো জীবাণু বা শৈবালের মতো প্রাণ যদি জৈব গ্যাস উৎপন্ন করে, তাহলে সেই গ্যাসের উপস্থিতি বর্ণালী বিশ্লেষণে ধরা পড়তে পারে।
তবে বর্তমানে বাসযোগ্য অঞ্চলে থাকা অনেক এক্সোপ্ল্যানেটের বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণ কঠিন। কারণ এসব গ্রহ তাদের নক্ষত্রের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে এবং উজ্জ্বল নক্ষত্রের কারণে গ্রহটিকে আলাদা করে দেখা কঠিন হয়।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভিনগ্রহের প্রাণের সন্ধানে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ বেড়েছে। তবে এ বিষয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো সতর্ক। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা এক জরিপে জ্যোতির্বিজ্ঞানী, জ্যোতিঃপদার্থবিদ ও অন্যান্য বিজ্ঞানীদের প্রায় ৯০ শতাংশ মনে করেছেন, মহাবিশ্বে সাধারণ ধরনের ভিনগ্রহের প্রাণ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। জটিল বা বুদ্ধিমান প্রাণের ক্ষেত্রে এই হার ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ।
ELT-এর মাধ্যমে এসব সম্ভাবনা যাচাইয়ের সুযোগ আরও বাড়তে পারে। তবে টেলিস্কোপটি ঠিক কী আবিষ্কার করবে, তা এখনো অজানা।
বিজ্ঞানীরা ELT চালু হওয়ার আগেই ভবিষ্যতের আরও বড় টেলিস্কোপ নিয়ে ভাবছেন। একাধিক টেলিস্কোপকে কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে স্থাপন করে সেগুলোকে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি বিশাল টেলিস্কোপের মতো ব্যবহার করার ধারণাও রয়েছে।
আরও দূরবর্তী ভবিষ্যতে সৌরজগতের বাইরের দিকে কোনো মহাকাশ টেলিস্কোপ পাঠিয়ে সূর্যের মহাকর্ষকে একটি ‘গ্র্যাভিটেশনাল লেন্স’ হিসেবে ব্যবহারের ধারণাও রয়েছে। এমন প্রযুক্তি বাস্তবায়িত হলে অন্য নক্ষত্রের চারপাশে থাকা পৃথিবীর আকারের গ্রহের পৃষ্ঠ পর্যন্ত মানচিত্রের মতো করে পর্যবেক্ষণ করার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে এসব এখনো ভবিষ্যতের ধারণা। আপাতত বিজ্ঞানীদের অপেক্ষা ELT-এর জন্য। ২০৩০-এর দশকে চিলির মরুভূমির এই বিশাল টেলিস্কোপ মহাবিশ্বের দিকে তাকালে কী দেখতে পাবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
