নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে, পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতায় বাড়ছে দুর্ভোগ
টানা ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর এবং পার্বত্য অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে গেছে। একই সঙ্গে পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
সরকারি ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও পাহাড়ধসের ঘটনায় বিভিন্ন এলাকায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। বিশেষ করে সুরমা, কুশিয়ারা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় আশপাশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্গত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।
অবিরাম বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড় কাটার প্রবণতা, অনিয়ন্ত্রিত বসতি স্থাপন এবং অতিবৃষ্টির সমন্বিত প্রভাবে পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক স্থানে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নৌযান ব্যবহার করে দুর্গম এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। চলতি মৌসুমে কয়েকটি অঞ্চলে রেকর্ডসংখ্যক বৃষ্টিপাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
তাদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা, জলাধার সংরক্ষণ এবং জলবায়ু অভিযোজনমূলক পদক্ষেপ জোরদার করা প্রয়োজন।
অবিরাম বৃষ্টির প্রভাবে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নিউমার্কেট, ধানমন্ডি, মিরপুর, মালিবাগ ও শান্তিনগরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় সড়কে পানি জমে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবনের নিচতলায় পানি প্রবেশ করায় অনেক স্থানে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী কয়েকদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতির কারণে দেশের কয়েকটি সমুদ্রবন্দর ও নদীবন্দরে সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চলমান বন্যা ও পাহাড়ধস পরিস্থিতি দেশের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগে রূপ নিয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করাকে এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
