রংপুর: উত্তরাঞ্চলের বহু কৃষকের কাছে সুপারি এখন আর শুধু গৃহস্থালির প্রয়োজন মেটানোর ফসল নয়, বরং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার অন্যতম নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। আলু, ধান ও ভুট্টা চাষে ক্রমবর্ধমান লোকসানের মধ্যে রংপুর, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট অঞ্চলের অসংখ্য পরিবার সুপারি গাছ থেকে পাওয়া আয় দিয়েই সংসারের ব্যয় নির্বাহ করছে।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বালারহাট বাজারে সুপারি বিক্রি করতে আসা কৃষক মোবারক হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে আলু ও ধান চাষে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি। ভুট্টার বাজারমূল্যও আশানুরূপ না হওয়ায় কৃষি আয় কমে গেছে। তবে বাড়ির আঙিনায় থাকা সুপারি গাছগুলো তার পরিবারের জন্য বড় সহায়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই বাজারের আরেক কৃষক ধনেশ্বর চন্দ্র বর্মণেরও অভিজ্ঞতা প্রায় একই। কয়েক দশক আগে লাগানো সুপারি গাছ থেকে পাওয়া আয় একসময় সন্তানের পড়াশোনার খরচ মেটাতে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে তা পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে।
কৃষকদের মতে, সুপারি চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অত্যন্ত কম। একবার গাছ বড় হয়ে ফল দেওয়া শুরু করলে দীর্ঘ ৩৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত উৎপাদন অব্যাহত থাকে। সামান্য জৈব সার ও পরিচর্যাতেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। বর্তমানে প্রতি ‘পোন’ সুপারির বাজারদর ৩০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে থাকায় কৃষকেরা উল্লেখযোগ্য মুনাফা পাচ্ছেন।
কুড়িগ্রামের এক বাণিজ্যিক চাষি শামসুল আলম জানান, তার কয়েক হাজার সুপারি গাছ রয়েছে। প্রতিবছর এসব গাছ থেকে লাখ লাখ টাকার আয় হয়, অথচ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় তুলনামূলকভাবে খুবই কম। ফলে অন্য ফসলের বাজারে অস্থিরতা থাকলেও সুপারি তাকে আর্থিক নিরাপত্তা দিচ্ছে।
লালমনিরহাটের কিছু এলাকায় সুপারি চাষ সামাজিক কর্মকাণ্ডেও ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় বাসিন্দারা রাস্তার ধারে লাগানো সুপারি গাছের ফল বিক্রি করে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অর্থ সংগ্রহ করছেন। পাশাপাশি এসব গাছ পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও মাটি ক্ষয় রোধেও সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ৫৫ লাখ সুপারি গাছ রয়েছে। এছাড়া চার থেকে ২০ বিঘা আয়তনের প্রায় ১ হাজার ৬০০টি বাণিজ্যিক বাগান গড়ে উঠেছে। অঞ্চলটিতে বছরে ৩০০ কোটিরও বেশি সুপারি উৎপাদিত হয়।
স্থানীয় পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ সুপারি সংগ্রহ করা হয়। পরে সংরক্ষণের মাধ্যমে সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। এ খাতকে কেন্দ্র করে শতাধিক পাইকারি ব্যবসায়ী সক্রিয় রয়েছেন এবং প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, একসময় শখের চাষ হিসেবে পরিচিত সুপারি এখন উত্তরাঞ্চলের একটি লাভজনক বাণিজ্যিক কৃষিপণ্যে পরিণত হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, কম উৎপাদন ব্যয় এবং স্থিতিশীল বাজারমূল্যের কারণে কৃষকদের আগ্রহও ক্রমশ বাড়ছে।
তাদের ভাষ্য, সুপারি শুধু কৃষকের অতিরিক্ত আয়ের উৎস নয়; এটি বহু পরিবারের শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কৃষি খাতের নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে সুপারি চাষ উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
