ঢাকা: সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক খাত থেকে এসেছে মিশ্র সংকেত। একদিকে বছরের শেষ মাসে রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও সামগ্রিক বার্ষিক হিসাব বলছে রপ্তানি খাতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যায়নি। অন্যদিকে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স অর্থনীতিতে স্বস্তির পরশ এনে দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই দুই প্রবণতা বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্য ও উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতির সামনে থাকা বাস্তব চিত্রকে স্পষ্ট করছে।
উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয় প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও তা আগের বছরের তুলনায় সামান্য কমেছে। জুন মাসে রপ্তানিতে শক্তিশালী উল্লম্ফন দেখা গেলেও তা পুরো বছরের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
বিশ্লেষকদের মতে, বছরের শেষ দিকে কিছু নতুন ক্রয়াদেশ, বিলম্বিত চালান রপ্তানি এবং ক্রেতাদের আস্থার আংশিক পুনরুদ্ধারের প্রভাব দেখা গেলেও তা এখনও রপ্তানি খাতের স্থায়ী পুনরুদ্ধারের প্রমাণ নয়।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে তৈরি পোশাক খাতের ধীরগতি। দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস এই খাতের আয় কমেছে, আর অন্যান্য রপ্তানি পণ্যে কিছু প্রবৃদ্ধি হলেও তা সামগ্রিক রপ্তানি কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও সীমিতসংখ্যক পণ্য ও বাজারের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল রয়ে গেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানি বহুমুখীকরণের কথা বলা হলেও বাস্তবে নতুন খাতগুলো প্রয়োজনীয় সহায়তা পায়নি। অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক মান সনদ, প্রযুক্তি, পরিবহন ব্যবস্থা, শুল্ক প্রক্রিয়া এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশাধিকার—সব ক্ষেত্রেই নতুন উদ্যোক্তারা নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন। ফলে প্রতিষ্ঠিত খাতগুলোই নীতিগত সুবিধা বেশি পাচ্ছে, আর সম্ভাবনাময় নতুন খাতগুলো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারছে না।
এদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ দেশের অর্থনীতিকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে প্রবাসী আয় ১৭ শতাংশের বেশি বেড়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, পরিশোধ ভারসাম্যের ওপর চাপ কমেছে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগক্ষমতা শক্তিশালী হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক করার উদ্যোগ এবং অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে কিছু পদক্ষেপের ফলেও বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীল রূপান্তরের বিকল্প নয়। কারণ এই আয় মূলত বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রমের ফল এবং তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশের শিল্প প্রতিযোগিতা বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ায় না।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত তাৎক্ষণিক সংকটে না থাকলেও এর ভিত্তি এখনও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ দেশের অর্থনীতি প্রধানত স্বল্পমূল্যের পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং আমদানি ব্যয়—সবকিছুর ওপরই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রপ্তানি খাতে মাঝারি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের ধারণা, বৈশ্বিক চাহিদা স্থিতিশীল থাকলে এবং পোশাক খাতে নতুন অর্ডার বাড়লে রপ্তানি আয় ৪৯ দশমিক ৫ থেকে ৫০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে পৌঁছাতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয়ের চাপ বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো রপ্তানি খাতকে শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় করা। এজন্য বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা, শুল্ক ও কাস্টমস সংস্কার, পরিবহন ব্যয় কমানো, অ-পোশাক রপ্তানিকারকদের সহায়তা বৃদ্ধি এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে।
তাদের ভাষ্য, শুধু রেকর্ড রেমিট্যান্স বা এক মাসের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে সন্তুষ্ট না থেকে উৎপাদন সক্ষমতা ও রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি।
