ঢাকা: কৃষি খাতে সরকারি বরাদ্দ ও নীতিগত সহায়তা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও এর প্রকৃত সুবিধা এখনও প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে পর্যাপ্তভাবে পৌঁছাতে পারেনি বলে মনে করছেন কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বাজেটের অঙ্ক বাড়ানোর পাশাপাশি কার্যকর বাস্তবায়ন এবং মাঠপর্যায়ে সেবা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: শস্যভিত্তিক কৃষি খাতে কৌশলগত আলোচনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব মতামত তুলে ধরেন। লাইটক্যাসেল পার্টনার্স ও সাসটেইনেবল অ্যাগ্রিকালচার ফাউন্ডেশন (এসএএফ) বাংলাদেশ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
আলোচনায় বলা হয়, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখা, কৃষিভিত্তিক শিল্পের সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের কৃষি খাত এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি, ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং বাজারসংযোগের সীমাবদ্ধতা খাতটির উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকি, ফসলের ক্ষয়ক্ষতি, বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং উন্নয়ন কর্মসূচির দুর্বল বাস্তবায়ন কৃষকদের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের মূল বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা।
এ ছাড়া সারসহ বিভিন্ন কৃষি সহায়তা কর্মসূচির জন্য ১৭ হাজার ১ কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও সামগ্রিক ভর্তুকি বরাদ্দ আগের বছরের তুলনায় সামান্য কমেছে, তবে কৃষি উপকরণের ওপর কর-সুবিধা বাড়ানোর মাধ্যমে উৎপাদকদের সহায়তার চেষ্টা করা হয়েছে বলে আলোচনায় উল্লেখ করা হয়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, উন্নয়ন বাজেটে কৃষি খাতের বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী অবকাঠামো এবং কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা প্রদানের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তবে বরাদ্দকৃত অর্থের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বক্তারা। তাদের মতে, উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কমে গেছে। ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার যথাক্রমে ৯৩ ও ৯৫ শতাংশ হলেও পরবর্তী দুই অর্থবছরে তা ৬০ থেকে ৬২ শতাংশে নেমে এসেছে।
আলোচকরা বলেন, বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে বরাদ্দের পরিমাণের ওপর নয়, বরং সেই অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে কৃষকের কল্যাণে ব্যবহার করা যায় তার ওপর। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমানো, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা, বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন তারা।
তাদের মতে, কৃষি খাতের দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর নিশ্চিত করতে হলে শুধু ভর্তুকি নয়, গবেষণা, উদ্ভাবন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কৃষকের সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই বাজেটের বাড়তি বরাদ্দ বাস্তব অর্থে কৃষক ও দেশের কৃষি অর্থনীতির উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
