বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রকৃতি ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে একসময় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল গাব ফল। বর্ষাকালে খাল-বিলের পাড়, গ্রামের ঝোপঝাড় কিংবা বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা গাবগাছ ছিল পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। বনভূমি সংকোচন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং দেশীয় ফলের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ায় গাবগাছ আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গাব বাংলাদেশের একটি দেশীয় ফল, যা আর্দ্র ও জলাভূমিপূর্ণ পরিবেশে ভালো জন্মে। দেশের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের নদী-খালবেষ্টিত এলাকায় একসময় এ গাছের ব্যাপক বিস্তার ছিল। দীর্ঘজীবী ও ঘন সবুজ পাতাবহুল এ গাছ বর্ষা মৌসুমে ফল দেয়। পাকার পর ফলের রঙ সবুজ থেকে হলুদ বা গাঢ় বর্ণ ধারণ করে।
গ্রামের প্রবীণ মানুষের স্মৃতিতে গাব শুধু একটি ফল নয়, বরং শৈশবের আনন্দ ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনের অংশ। গাছ থেকে ফল পেড়ে খাওয়ার যে অভিজ্ঞতা একসময় ছিল গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক ঘটনা, তা আজকের প্রজন্মের কাছে প্রায় অচেনা।
গত কয়েক দশকে দেশের গ্রামীণ ভূদৃশ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। কৃষিজমির সম্প্রসারণ, বসতি নির্মাণ এবং বন উজাড়ের কারণে গাবগাছের সংখ্যা দ্রুত কমেছে। পাশাপাশি দ্রুত বর্ধনশীল ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক বৃক্ষরোপণের প্রবণতা দেশীয় প্রজাতিগুলোর স্বাভাবিক বিস্তারকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে নতুন করে গাবগাছ জন্মানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।
গাবগাছের সংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গে ফলটি সম্পর্কেও মানুষের আগ্রহ হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে অনেক শিশু-কিশোর গাব ফলের নাম পর্যন্ত জানে না। এতে শুধু একটি ফল নয়, দেশের লোকজ ঐতিহ্য ও খাদ্যসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ঐতিহ্যগতভাবে গাবের রয়েছে নানা ভেষজ ব্যবহার। গ্রামীণ জনপদে দীর্ঘদিন ধরে এর ফল, পাতা ও বাকল বিভিন্ন রোগের ঘরোয়া চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের মতে, কাঁচা গাব হজমজনিত কিছু সমস্যায় উপকারী হতে পারে। গাছের বাকলে থাকা ট্যানিন প্রদাহ কমাতে সহায়ক বলে ধারণা করা হয়। গ্রামীণ এলাকায় ক্ষতস্থানে গাবের বাকল থেকে তৈরি নির্যাস ব্যবহারের প্রচলনও রয়েছে।
পুষ্টিগুণের দিক থেকেও ফলটি গুরুত্বপূর্ণ। এতে থাকা বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
গাবগাছের গুরুত্ব শুধু ফলেই সীমাবদ্ধ নয়। এর শক্ত ও টেকসই কাঠ আসবাবপত্র এবং কৃষিকাজের বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। অতীতে নৌকা নির্মাণেও গাবগাছের আঠার বিশেষ কদর ছিল। কাঠের নৌকার ফাঁকফোকর বন্ধ করতে এ আঠা ব্যবহৃত হতো, যা নদীনির্ভর জনপদে অত্যন্ত মূল্যবান উপকরণ হিসেবে বিবেচিত ছিল।
পরিবেশবিদদের মতে, গাবগাছ হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি দেশীয় ফলের বিলুপ্তি নয়; এটি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তারা বলছেন, গাব সংরক্ষণে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চারা উৎপাদন বৃদ্ধি, জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে গাবকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেশীয় ফল সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে গাবের পুষ্টিগুণ, ভেষজ ব্যবহার এবং সম্ভাব্য বাণিজ্যিক মূল্য নিয়ে আরও গবেষণা পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে হারিয়ে যেতে বসা এই দেশীয় ফল আবারও বাংলাদেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও খাদ্য ঐতিহ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ফিরে পেতে পারে।
