দেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাত, বিভেদ ও সহিংসতার অবসান ঘটিয়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ বা সত্য ও পুনঃসমঝোতা কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো কমিশন গঠিত হয়নি। সংসদেও বিষয়টি নিয়ে উল্লেখযোগ্য আলোচনা দেখা যায়নি।
সর্বশেষ নির্বাচনের ইশতেহারে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ এবং এনসিপি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের কথা বলেছে। দলগুলোর বক্তব্য, সরকার দায়িত্ব নিয়েছে মাত্র ছয় মাস হলো এবং সামনে এ বিষয়ে কাজ করার সময় রয়েছে। পাশাপাশি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এখনো তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ স্বীকার করেনি এবং বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি অব্যাহত রেখেছে—এমন পরিস্থিতিতে কমিশনের উদ্যোগ নেওয়া কঠিন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারও এ ধরনের কমিশনের কথা বলেছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনী ইশতেহারেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এখনো ‘কথার কথা’ হিসেবেই রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে সংঘাত ও বিভাজনের দীর্ঘ ধারাবাহিকতা রয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষণ, নির্যাতন, গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলেও গুম, খুন ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বড় ধরনের নির্যাতন, হত্যা, গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ সামনে আসে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। এখনো সেই নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। দলের অনেক নেতা-কর্মী আত্মগোপনে আছেন এবং অনেকে দেশ ছেড়েছেন। এমন বাস্তবতায় অতীতের সংঘাত ও সহিংসতার সত্য উদ্ঘাটন, ভুক্তভোগীদের স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কমানোর লক্ষ্যে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ কমিশনের প্রস্তাব সামনে এসেছে।
২০২৫ সালের ১০ মে বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর দ্বিতীয় খসড়া নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশনের প্রসঙ্গ ওঠে।
সেখানে কবি ও রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন, গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার করতে গেলে অন্তর্বর্তী সরকারের টিকে থাকা নিয়ে বাস্তবতার প্রশ্ন রয়েছে। অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে এ ধরনের সমস্যা সমাধানের পথ খোঁজার কথাও বলেন তিনি।
একই সভায় তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানান, সরকার ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ কমিশন গঠন করবে। তাঁর মতে, অনন্তকাল হানাহানি করে জাতির মুক্তি সম্ভব নয়। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন রয়েছে এবং গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের উপযুক্ত শাস্তির পাশাপাশি তাদের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্নতার বিষয়টিও প্রতিষ্ঠা করা দরকার।
কমিশনের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ২০২৫ সালের মে মাসে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করেছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তবে পরে এ উদ্যোগ আর এগোয়নি।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে বিএনপি ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেয়। দলটি বলেছে, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং বিভাজন অতিক্রম করে অভিন্ন জাতীয় সত্তা প্রতিষ্ঠাই তাদের লক্ষ্য।
জামায়াতে ইসলামীও ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের কথা বলেছে। এ জন্য সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও স্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন এবং জাতিসংঘের কারিগরি সহায়তা নেওয়ার কথা তাদের ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গত ১৫ বছরে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের সত্য উদ্ঘাটন এবং নতুন অধ্যায় শুরুর কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে এনসিপি তাদের ইশতেহারে গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এর আগে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও ‘সমন্বিত সর্বদলীয় সত্যানুসন্ধান ও বিভেদ নিরসন’ কমিশন গঠনের কথা বলেছিল। তবে নির্বাচনের পর ওই জোট নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় এবং প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়িত হয়নি।
ক্ষমতাসীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের বিষয়টি নির্বাচনী ইশতেহারে চিন্তাভাবনা করেই রাখা হয়েছে। ইশতেহারের অন্যান্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মতো ধীরে ধীরে এটিও বাস্তবায়ন করা হবে বলে তিনি জানান।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারে গেলে ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। তাঁর মতে, এ ধরনের কাজ সরকারে থাকা ছাড়া করা সম্ভব নয়। সংসদে এখনো আলোচনা না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সংসদের মাত্র একটি অধিবেশন হয়েছে; সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশনের কথা তাঁরা বিভিন্ন সময় বলেছেন। তবে তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ এখনো চোরাগোপ্তা হামলা, অগ্নিসংযোগ ও হুমকি অব্যাহত রেখেছে এবং জুলাইয়ের ঘটনাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরছে। তাঁর মতে, পুনঃসমঝোতার প্রক্রিয়া শুরুর আগে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ভুল স্বীকার করা প্রয়োজন।
দীর্ঘ সংঘাতের পর জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন একটি বহুল আলোচিত উদাহরণ। বর্ণবাদী শাসনের অবসানের পর ১৯৯৫ সালে নেলসন ম্যান্ডেলার সরকার কমিশনটি গঠন করে।
কমিশনে ১৭ জন কমিশনার ছিলেন। তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে ছিল ১৯৬০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্ত, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য গ্রহণ, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ক্ষমার ব্যবস্থা, ঐতিহাসিক দলিল তৈরি এবং ক্ষতিপূরণের নীতিমালা প্রণয়ন।
কমিশন ২২ হাজারের বেশি লিখিত অভিযোগ পায়। সাধারণ ক্ষমার জন্য সাত হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়ে এবং প্রায় দেড় হাজার আবেদনকারী ক্ষমা পান। ১৯৯৮ সালে কমিশন প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
দক্ষিণ আফ্রিকার পর সিয়েরা লিওন, লাইবেরিয়া, কানাডা, আর্জেন্টিনা, চিলি, ঘানা, গুয়াতেমালা, পেরু, পূর্ব তিমুর ও মরক্কোসহ বিভিন্ন দেশও সত্য ও পুনঃসমঝোতার লক্ষ্যে কমিশন গঠন করেছে।
বাংলাদেশে ২০০৮ সালে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ‘সত্য ও জবাবদিহি কমিশন’ বা ট্রুথ কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের পর বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রেপ্তার হন। পরে দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের অপরাধ স্বীকার এবং অবৈধ অর্থের নির্দিষ্ট অংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার সুযোগ দিতে কমিশন গঠন করা হয়।
সাবেক বিচারপতি হাবিবুর রহমান খানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ওই কমিশনের মেয়াদ ছিল পাঁচ মাস। তবে একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের ১৩ নভেম্বর হাইকোর্ট কমিশনটিকে অবৈধ ঘোষণা করেন। পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারও কমিশনটিকে স্বীকৃতি দেয়নি।
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, দীর্ঘদিনের সহিংসতা ও ক্ষোভ সমাজে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা তৈরি করে এবং এর প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যেতে পারে।
তিনি বলেন, সত্য উদ্ঘাটনের মাধ্যমে সমঝোতার জায়গায় আসা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল ও অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে কথা বললেও বাস্তবে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না।
আনু মুহাম্মদের ভাষায়, “ঐতিহাসিক সব জখম নিরাময় না করলে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া মুশকিল।”
- বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি নির্বাচনী ইশতেহারে সত্য ও পুনঃসমঝোতা কমিশনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
- ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ছয় মাস পরও কমিশন গঠিত হয়নি।
- সংসদে বিষয়টি নিয়ে উল্লেখযোগ্য আলোচনা নেই।
- রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, সামনে এখনো সময় আছে এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় উদ্যোগটি কঠিন।
- বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের সহিংসতা ও বিভাজনের সমাধানে সত্য উদ্ঘাটন ও পুনঃসমঝোতার উদ্যোগ প্রয়োজন।
