পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, সে বিষয়ে সরকারি কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সাধারণ পাসপোর্ট জমা দিয়ে সরকারি পাসপোর্ট গ্রহণ করেন এবং এরপর একাধিক বিদেশ সফর করেছেন।
সিলেটের ওসমানীনগরে জন্ম নেওয়া হুমায়ুন কবির মাত্র আড়াই বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে চলে যান। সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা ও উচ্চশিক্ষা। তিনি যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব অর্জন করেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গত শুক্রবার তিনি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৩ ফেব্রুয়ারি হুমায়ুন কবির তাঁর সাধারণ সবুজ পাসপোর্ট জমা দেন। একই মাসে তিনি সরকারি বা কূটনৈতিক পাসপোর্ট গ্রহণ করেন। ওই পাসপোর্ট ব্যবহার করে প্রথমবার সৌদি আরব সফর করেন তিনি।
গত ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, ভারত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরিশাস ও ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে অন্তত ১১ বার সরকারি পাসপোর্টে সফর করেছেন হুমায়ুন কবির।
যুক্তরাজ্য বিএনপির একাধিক নেতা তাঁকে ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করলেও তিনি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগে সেই নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর কাছেও হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছেন—এমন তথ্য নেই।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত শনিবার হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ দপ্তরেও যোগাযোগ করা হয়; সেখান থেকেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্য নন—এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকেও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া যায়। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে।
সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে অথবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সদস্য থাকার যোগ্য নন।
এর আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ও বিদেশি নাগরিকত্বের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ওই নির্বাচনের আগে ২৩ জন প্রার্থী বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছিলেন। নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদনের প্রমাণ দেখাতে পারা প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছিল নির্বাচন কমিশন।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়ার মতে, বিদেশি নাগরিকত্ব বহাল থাকলে বাংলাদেশে প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সাংবিধানিক যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, হুমায়ুন কবির নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না বা ত্যাগের আবেদন করেছেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হয়; শুধু আবেদন করলেই নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যায় না।
হুমায়ুন কবিরের জন্ম সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার হবসপুর গ্রামে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স, ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ এবং লিডস ল স্কুল থেকে তিনটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।
পেশাগত জীবনে তিনি লন্ডনের মেয়রের দপ্তরসহ ব্রিটিশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে কাজ করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের শুরু হয় যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির রাজনীতির মাধ্যমে।
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সাবেক ডেপুটি মেয়র অহিদ আহমদ চৌধুরীর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত হুমায়ুন কবির লেবার পার্টির বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো শাখার সেক্রেটারি ছিলেন।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক বিষয়ক) পদে দায়িত্ব পান।
হুমায়ুন কবির সরকারি পাসপোর্ট ব্যবহার করে দায়িত্ব পালন ও বিদেশ সফর করলেও তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রকাশ্য সরকারি তথ্য নেই। ফলে বিদেশি নাগরিকত্বের বিষয়টি তাঁর প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সাংবিধানিক যোগ্যতার সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
