হঠাৎ আতঙ্ক বা তীব্র উদ্বেগের মুহূর্তে নিজেকে শান্ত রাখতে ‘৫-৪-৩-২-১ গ্রাউন্ডিং টেকনিক’ কার্যকর সহায়ক হতে পারে বলে জানিয়েছেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের ব্যবহারভিত্তিক এই সহজ পদ্ধতি মানুষের মনোযোগকে উদ্বেগজনিত চিন্তা থেকে সরিয়ে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি উদ্বেগের তীব্রতা কমাতে এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হলেও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে চিকিৎসা বা থেরাপির বিকল্প নয়।
২০ জুলাই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আতঙ্ক বা উদ্বেগের আক্রমণ অনেক সময় কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই দেখা দেয়। এ সময় হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, হাত কাঁপা এবং নেতিবাচক চিন্তার ঘূর্ণাবর্তে পড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ‘৫-৪-৩-২-১’ পদ্ধতি সহজ ও দ্রুত প্রয়োগযোগ্য একটি কৌশল হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
কী এই ৫-৪-৩-২-১ পদ্ধতি?
এটি মূলত একটি মাইন্ডফুলনেস বা সচেতন মনোযোগের অনুশীলন। এর লক্ষ্য হলো চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে উদ্বেগপূর্ণ চিন্তা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া।
এই পদ্ধতিতে পর্যায়ক্রমে চিহ্নিত করতে হয়—
- ৫টি জিনিস যা দেখা যায়
- ৪টি জিনিস যা স্পর্শ করা যায়
- ৩টি শব্দ যা শোনা যায়
- ২টি গন্ধ যা অনুভব করা যায়
- ১টি স্বাদ যা উপলব্ধি করা যায়
যদি কোনো একটি ইন্দ্রিয় ব্যবহার করা সম্ভব না হয়, তাহলে সেই অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত পরিচিত কোনো স্মৃতি কল্পনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
কেন কার্যকর হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্বেগ বা আতঙ্কের সময় মস্তিষ্ক সম্ভাব্য হুমকির ওপর অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে থাকে। এর ফলে শরীরের ‘স্ট্রেস রেসপন্স’ সক্রিয় হয়ে হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস ও পেশির টান বৃদ্ধি পায়।
গ্রাউন্ডিং অনুশীলন ব্যক্তিকে নিজের ভেতরের ভয় বা দুশ্চিন্তা থেকে সরিয়ে বাইরের বাস্তব পরিবেশে মনোযোগ দিতে সাহায্য করে। এতে উদ্বেগের চক্র সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে এবং মানসিক স্থিরতা ফিরে আসতে পারে।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) জানিয়েছে, মাইন্ডফুলনেসভিত্তিক চর্চা আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং চাপ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথ (এনসিসিআইএইচ) বলছে, মাইন্ডফুলনেসভিত্তিক হস্তক্ষেপ উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও মানসিক অস্থিরতার উপসর্গ হ্রাসে সহায়ক হতে পারে।
কীভাবে অনুশীলন করবেন?
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, উদ্বেগ অনুভব করলে প্রথমে এক বা দুইবার ধীরে গভীর শ্বাস নিতে হবে। এরপর চারপাশে তাকিয়ে পাঁচটি দৃশ্যমান বস্তু শনাক্ত করতে হবে। তারপর স্পর্শ করা যায় এমন চারটি জিনিস, শোনা যায় এমন তিনটি শব্দ, দুটি গন্ধ এবং একটি স্বাদের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণত দুই থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন করা যায়।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
‘ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি রিভিউ’-এ প্রকাশিত একটি পর্যালোচনা গবেষণায় দেখা গেছে, মাইন্ডফুলনেসভিত্তিক হস্তক্ষেপ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগের উপসর্গ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। অন্যদিকে ‘জামা ইন্টারনাল মেডিসিন’-এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও ব্যথা ব্যবস্থাপনায় মাঝারি মাত্রার ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মানসিক সুস্থতা রক্ষায় পেশাদার সেবার পাশাপাশি চাপ ব্যবস্থাপনা ও মাইন্ডফুলনেস চর্চাকে কার্যকর আত্ম-যত্ন পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
যদিও ৫-৪-৩-২-১ পদ্ধতি নিয়ে নির্দিষ্ট গবেষণা সীমিত, তবুও ট্রমা-সচেতন থেরাপি ও কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপিতে (সিবিটি) সংবেদনভিত্তিক গ্রাউন্ডিং কৌশল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
কোন পরিস্থিতিতে উপকারী হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিচের পরিস্থিতিগুলোতে এই পদ্ধতি সহায়ক হতে পারে—
- আতঙ্কজনিত আক্রমণ শুরু হওয়ার অনুভূতি হলে
- অতিরিক্ত উদ্বেগে ভুগলে
- নেতিবাচক বা বিপর্যয়মূলক চিন্তা বাড়লে
- কোনো দুঃসংবাদে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলে
- কর্মক্ষেত্রের চাপের সময়
- পরীক্ষা বা উপস্থাপনার আগে
- ভ্রমণজনিত উদ্বেগে
- মানসিকভাবে উদ্দীপক বা ট্রিগারিং পরিস্থিতির পর
সীমাবদ্ধতাও রয়েছে
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ৫-৪-৩-২-১ পদ্ধতি উদ্বেগজনিত রোগের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নয়। এটি কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি, মনোরোগ বিশেষজ্ঞের দেওয়া ওষুধ বা ট্রমাভিত্তিক চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
যদি আতঙ্ক বা উদ্বেগ ঘন ঘন দেখা দেয়, দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে বা আত্মক্ষতির চিন্তার মতো গুরুতর লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অন্যান্য সহায়ক অভ্যাস
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গ্রাউন্ডিং কৌশলের পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল পরিহার, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, ধ্যান, সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং প্রয়োজন হলে থেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দেন।
তাদের মতে, আত্ম-যত্নের অভ্যাস এবং পেশাদার সহায়তার সমন্বয় দীর্ঘমেয়াদে মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
