১১ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ; জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে এবার বড় ধরনের পতন হয়েছে। ১১ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার নেমে এসেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। মোট পরীক্ষার্থীর ৩৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ অর্থাৎ ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন অকৃতকার্য হয়েছে। ইংরেজি ও গণিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অনুত্তীর্ণ হওয়াকে ফল বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা।
সোমবার প্রকাশিত ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। গতবারের তুলনায় এ সংখ্যা কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন। মোট উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ জিপিএ-৫ পেয়েছে।
এর আগে ২০০৭ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ এবারকার পাসের হার তার পর গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বিভাগভিত্তিক ফলাফলে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে মানবিক বিভাগ। এ বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। বিপরীতে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ।
ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মানবিক বিভাগের অর্ধেকের বেশি পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতের ফল সামগ্রিক পাসের হারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
অন্যদিকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। অধিকাংশ শিক্ষা বোর্ডেই এ বিষয়ে পাসের হার ৯৮ শতাংশের ওপরে। বাংলা, ইতিহাস ও বিজ্ঞান বিষয়েও তুলনামূলক ভালো ফল করেছে শিক্ষার্থীরা।
পাসের হার ও জিপিএ-৫—দুই সূচকেই এবারও ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে মেয়েরা। চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ৯ লাখ ১১ হাজার ৭৯১ জন ছাত্রী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ৬ লাখ ৭ হাজার ৯৩৯ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। ছাত্রীদের পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
অন্যদিকে ৯ লাখ ১৭ হাজার ৬৯৪ জন ছাত্র পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৯৩৮ জন। ছেলেদের পাসের হার ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও মেয়েরা এগিয়ে। এবার ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন ছাত্রী এবং ৫২ হাজার ৭৮০ জন ছাত্র জিপিএ-৫ পেয়েছে। অর্থাৎ ছেলেদের চেয়ে ১১ হাজার ১১৬ জন বেশি ছাত্রী সর্বোচ্চ গ্রেড পেয়েছে। গত আট বছর ধরেই মাধ্যমিকের ফলাফলে পাসের হারে মেয়েরা ছেলেদের পেছনে ফেলছে।
এবার ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৩৪টি। এক বছরের ব্যবধানে এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় ২২৬টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৮৬টি। অর্থাৎ এক বছরে শূন্য পাস করা মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়েছে ১৪০টি।
অন্যদিকে শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কমেছে। এবার ৬৬৯টি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৯৮৪টি।
চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন এবং ফেল করেছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। গত বছরের তুলনায় এবার অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
ফল বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে চলছে নানা বিশ্লেষণ। শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের মতে, ইংরেজি ও গণিতে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করায় এবার সামগ্রিক পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের পরীক্ষার্থীরা এ দুটি বিষয়ে বেশি অনুত্তীর্ণ হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, ‘এবার ফলাফল খারাপ নয়, বরং সুন্দর হয়েছে।’
শিক্ষাবিদদের মতে, ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতার বিষয়টি নতুন নয়। প্রতিবছরই এ দুটি বিষয়ে তুলনামূলক বেশি শিক্ষার্থী ফেল করে। তবে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার কারণ খুঁজতে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার বাইরে বেশি সময় ব্যয় করছে। বিশেষ করে মোবাইল ফোন ব্যবহারে সময় দেওয়ার কারণে গণিত ও ইংরেজির মতো তুলনামূলক কঠিন বিষয়ে মনোযোগ কমছে। তাঁর মতে, এ দুটি বিষয়ের ফল খারাপ হওয়ায় ফেলের হার বাড়ছে এবং সামগ্রিক পাসের হার কমে যাচ্ছে।
১১ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এবং সর্বনিম্ন মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। শুধু নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড বিবেচনায় নিলে সবচেয়ে কম পাসের হার ময়মনসিংহ বোর্ডে।
ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ, রাজশাহীতে ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ, কুমিল্লায় ৬৫ দশমিক ৪২ শতাংশ, যশোরে ৬৬ দশমিক ২৭ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ, বরিশালে ৬০ দশমিক ৩৫ শতাংশ, সিলেটে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ, দিনাজপুরে ৫৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ এবং ময়মনসিংহে ৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আর বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি (ভোকেশনাল) ও দাখিল (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ।
ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাস করেছে ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং গণিতে ৬৯ দশমিক ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ ইংরেজিতে প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৩৩ জন এবং গণিতে প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। ময়মনসিংহ ও মাদ্রাসা বোর্ডে গণিতে পাসের হার ৬৯ শতাংশের ঘরে।
এবার আইসিটি বিষয়ে অধিকাংশ বোর্ডে প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করলেও পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও উচ্চতর গণিতেও তুলনামূলক ভালো ফল এসেছে। ১১ বোর্ডের মধ্যে সাতটিতে পদার্থবিজ্ঞানে পাসের হার ৯০ শতাংশের বেশি। অন্য তিন বোর্ডে এ হার ৮০ শতাংশের ঘরে। রসায়নে আট বোর্ডে পাসের হার ৯০ শতাংশের ওপরে এবং বাকি তিন বোর্ডেও ৮২ শতাংশের বেশি। উচ্চতর গণিতে সব বোর্ডেই পাসের হার ৯০ শতাংশের ওপরে।
জিপিএ-৫ পাওয়ার শতকরা হারে শীর্ষে রয়েছে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৬ হাজার ১১৩ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। এ হিসাবে জিপিএ-৫ পাওয়ার হার ৯ দশমিক ১৫ শতাংশ।
এর পরেই রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে ৩ লাখ ৬৪ হাজার ১৮৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৩ হাজার ২৫৩ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। সংখ্যার বিচারে অবশ্য ঢাকাই শীর্ষে।
এ ছাড়া যশোর বোর্ডে ১ লাখ ৩২ হাজার ৯৪০ জনের মধ্যে ১১ হাজার ৪৭৮ জন, দিনাজপুরে ১ লাখ ৮০ হাজার ৭৫২ জনের মধ্যে ১৩ হাজার ৬৩৯ জন, চট্টগ্রামে ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জনের মধ্যে ৯ হাজার ৩৯৮ জন, কুমিল্লায় ১ লাখ ৪৫ হাজার ৮৩৫ জনের মধ্যে ৯ হাজার ৮১৪ জন, ময়মনসিংহে ১ লাখ ৫ হাজার ২৮ জনের মধ্যে ৫ হাজার ৭০০ জন, সিলেটে ৮৯ হাজার ৭৯ জনের মধ্যে ৩ হাজার ৮৩৬ জন এবং বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে ৮০ হাজার ৪৫৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২ হাজার ৭৭৮ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।
এবার বিদেশে থেকে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেয় ৪০২ জন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩৫৪ জন। চলতি বছরের এসএসসি লিখিত পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ২১ এপ্রিল।
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতেই আসন্ন শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে আবেদন নেওয়া হবে এবং মেধাক্রম ও শিক্ষার্থীদের পছন্দের ভিত্তিতে ভর্তি সম্পন্ন হবে।
তবে এবার পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ১৩ লাখ ৬১ হাজার আসন খালি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
