গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পর এর ফল বা সংস্কার প্রস্তাবের কোনো অংশ অস্বীকার করা দ্বিচারিতা বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, জুলাই সনদ মেনে নেওয়ার কথা বললেও গণভোটের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি গ্রহণ না করার অবস্থান পরস্পরবিরোধী।
শুক্রবার খুলনা প্রেসক্লাবের লিয়াকত আলী মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক যুব দিবস উপলক্ষে আয়োজিত যুব সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গোলাম পরওয়ার এসব কথা বলেন। খুলনা মহানগর জামায়াতের যুব ও ক্রীড়া বিভাগ এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি সরাসরি গণভোটের ফল মেনে নেওয়ার কথা না বলে জুলাই সনদ গ্রহণের কথা বলছে। তাঁর ভাষ্য, নোট অব ডিসেন্টগুলো বাদ দিলে জুলাই সনদের বাকি অংশে সংবিধানের বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন থাকবে না। তাই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে পরে তার ফল না মানাকে তিনি ‘মুনাফেকি’ ও ‘দ্বিচারিতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
গণভোটের সিদ্ধান্তকে আংশিকভাবে গ্রহণের সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, একই দিনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফলের একটি গ্রহণ করে অন্যটি প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব নয়।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একই মায়ের পেটে জন্ম নেওয়া যমজ দুই সন্তানের একজনকে স্বীকার করে আরেকজনকে অস্বীকার করার মতো ঘটনা ঘটছে। নিজের দেওয়া ভোটের একটি অংশ মেনে অন্য অংশ অস্বীকার করা যায় না। একই দিনে হওয়া জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের ফলের মধ্যে একটিকে গ্রহণ করে আরেকটিকে অস্বীকার করা যায় না। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার মানে হলো সব কটি সংস্কার প্রস্তাবকে আমি মেনে নিয়েছি।’
গোলাম পরওয়ারের দাবি, গণভোটের সংস্কার প্রস্তাব মেনে নিলে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা দূর হবে এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ কারণেই জুলাই সনদ কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ধানের শীষের ফলাফল মানলে ভালো লাগে। কারণ, এটা মানলে এমপি হওয়া যায়, মন্ত্রী হওয়া যায়। আর গণভোট মানলে হাসিনার ফ্যাসিবাদী, কর্তৃত্ববাদী শাসনের সংবিধানের সমস্ত কাঠামো পরিবর্তন করে নতুন রাষ্ট্রের যে বন্দোবস্ত, যেটা ঐকমত্য কমিশনে হয়েছিল, ওইটা মানতে হয়। ওইটা মানলে প্রধানমন্ত্রীর অসীম ক্ষমতা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতায় ভারসাম্য না থাকা—এসব বিষয় থাকে না। তাহলে তাঁদের কর্তৃত্ববাদী শাসন থাকবে না। এ জন্য তাঁরা এগুলো বাদ দিয়ে মানতে চাচ্ছেন। তাই তো জুলাই সনদ তাঁদের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
নতুন বাংলাদেশে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, লুটপাট, দুর্নীতি, দলীয়করণ ও ভিন্নমতের ওপর হামলার কোনো জায়গা থাকা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে চাঁদাবাজি, মাস্তানি, লুটপাট ও মাদকের সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। রাজনীতির নামে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসকে তিনি সমাজের বড় ব্যাধি হিসেবে উল্লেখ করে এসবের বিরুদ্ধে তরুণদের নেতৃত্বে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
বিভিন্ন জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে দলীয় লোকজন নিয়োগের বিষয়েও সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর মতে, এর ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ঠিকাদারি, টেন্ডার ও অর্থ ভাগাভাগির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার পর জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভুলে যাওয়া রাজনীতির একটি বড় সমস্যা। এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রত্যাশিত পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।
তিনি আরও বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। দলীয় পরিচয়ের কারণে অন্য কারও জনপ্রতিনিধিদের কাজে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
খুলনা মহানগর জামায়াতের যুব ও ক্রীড়া বিভাগের সভাপতি মুকাররম আনসারী সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। সঞ্চালনা করেন বিভাগের সেক্রেটারি মো. হামিদুল ইসলাম খান।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ, মহানগর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল, জামায়াতের যুব ও ক্রীড়া বিভাগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য মো. রাকিব হাসান।
