প্রায় চার দশক পর ২০২০ সাল থেকে আবারও নিয়মিত পদ্ম ফুটছে বাঘমারা বিলে; ফুল রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রশাসনের
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার শাকুয়াদীঘি এলাকার বাঘমারা বিলে ফুটেছে শত শত পদ্ম। ভাদ্রের শুরু থেকে কলি থেকে ফুল হয়ে ফুটতে শুরু করা পদ্মের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই সেখানে ছুটে আসছেন পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমীরা।
গত শনিবার দুপুরে বাঘমারা বিলে গিয়ে দেখা যায়, বিলজুড়ে ফুটে আছে শত শত পদ্ম। প্রকৃতির এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, শীতের আগমন পর্যন্ত বিলটিতে পদ্মফুলের সৌন্দর্য অব্যাহত থাকবে।
তাড়াশের স্থানীয় একটি ডিগ্রি কলেজের বাংলার শিক্ষক সনাতন কুমার দাশ জানান, দীর্ঘ বিরতির পর ২০২০ সাল থেকে বাঘমারা বিলে নিয়মিতভাবে পদ্মফুল ফুটছে। প্রায় চার দশক সেখানে পদ্মের দেখা মেলেনি। পদ্মের এই ফিরে আসা তাড়াশের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার মানুষের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে।
রায়গঞ্জ উপজেলা সদর ধানগড়া মহিলা কলেজের জীববিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক উম্মে নাফসুন বলেন, পদ্ম একটি বহুবর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ। অনুকূল পরিবেশ পেলে এই উদ্ভিদ আবারও বংশবিস্তার করতে পারে। চলনবিলের বাঘমারা বিলেও এমনটাই ঘটেছে বলে তিনি জানান।
পদ্মফুলের বিভিন্ন প্রজাতি ও রঙের প্রসঙ্গও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জন্মানো পদ্মকে বৈশিষ্ট্য অনুসারে দুটি প্রজাতিতে ভাগ করা হয়—এশিয়ান বা ইন্ডিয়ান লোটাস এবং আমেরিকান বা ইয়েলো লোটাস। এশীয় পদ্মের মধ্যে মসৃণ সাদা ও হালকা গোলাপি রঙের পদ্ম রয়েছে।
অধ্যক্ষ এম এ হামিদের ‘চলনবিলের ইতিকথা’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮২৭ সালে চলন বিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল ৫০০ বর্গমাইলের বেশি। ১৯০৯ সালের এক জরিপ প্রতিবেদনে এর আয়তন ১৪২ বর্গমাইল উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে চলনবিলের জলমগ্ন এলাকা মাত্র ৮৫ বর্গকিলোমিটার।
চলনবিল এলাকায় বিভিন্ন নামে ১ হাজার ৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল রয়েছে। একসময় এসব বিলে পদ্ম, শাপলা, মাখনা, সিঙ্গট, গেচু, চেচুয়া ও ভাতসোলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদ, ফার্ন, মস ও শৈবাল পাওয়া যেত। তবে এসবের অনেক প্রজাতিই বর্তমানে বিপন্ন এবং কিছু প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
বাঘমারা বিলের পদ্ম দেখতে আসা দর্শনার্থীদের কেউ কেউ নির্বিচারে ফুল তুলে নিচ্ছেন। এতে অন্য দর্শনার্থীরা পদ্মের সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পদ্মবিলে বেড়াতে আসা কুড়মালি ভাষার লেখক উজ্জ্বল কুমার মাহাতো বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি এই বিলের পদ্মফুলের সৌন্দর্যের কথা শুনে আসছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। তবে দর্শনার্থীদের নির্বিচারে পদ্মফুল তোলাকে তিনি ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন। অন্যদেরও এই সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, পদ্মফুল রক্ষার চেষ্টা করেও তাঁরা সফল হচ্ছেন না। এ বিষয়ে তিনি প্রশাসনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা করেন।
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, তিনি বাঘমারা বিলের পদ্মের কথা শুনেছেন। ফুল রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ বাঘমারা বিলের পদ্ম এখন স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। তবে এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে পদ্মফুল নির্বিচারে না তোলার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থানীয়রা।
