সীমান্ত দিয়ে আসছে নিম্নমানের ভারতীয় চা, কম দামে কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা
চায়ের দেশ হিসেবে পরিচিত সিলেটে চোরাইপথে ভারত থেকে আসা নিম্নমানের চায়ের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। স্থানীয়ভাবে ‘বুঙ্গার চা’ নামে পরিচিত এসব নিম্নমানের ভারতীয় চা সিলেটের বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে এর চাহিদা রয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, চোরাই চায়ের আগ্রাসনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সিলেটের উন্নতমানের দেশীয় চায়ের বাজার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে ১৬৮টি চা বাগান রয়েছে। এর মধ্যে গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে অবৈধ পথে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ চা পাতা বাংলাদেশে ঢুকছে। অন্যান্য চোরাই পণ্যের সঙ্গে একটি চক্র এসব চা পাতাও সীমান্ত পার করে আনছে।
সীমান্ত দিয়ে আনার পর চা পাতাগুলো স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হয়। পরে সুযোগ বুঝে তা সিলেট শহরে এনে বিভিন্ন খুচরা দোকানে সরবরাহ করা হয়। সূত্র বলছে, সিলেট সীমান্ত দিয়ে ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গের চা বেশি আসে। এর পাশাপাশি মেঘালয়, অরুণাচল, মণিপুর, মিজোরাম ও নাগাল্যান্ড থেকেও অল্প পরিমাণে চা আসার তথ্য রয়েছে।
সিলেটের কাছাকাছি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে খোলা চা পাতা পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়। নিম্নমানের এসব চা চোরাকারবারিরা সিলেট সীমান্ত দিয়ে নিয়ে আসে। অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রতি কেজি চায়ের সর্বনিম্ন বাজারমূল্য ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। ফলে দামের বড় ব্যবধানের কারণে চোরাই ভারতীয় চায়ের প্রতি খুচরা বাজারে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
খোলা চোরাই চায়ের প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে নিম্ন আয়ের মানুষ রয়েছেন। কম দামে চা পাওয়ার আশায় যারা এসব চা কিনছেন, তাদের অনেকেই গুণগত মানের দিক থেকে প্রতারিত হচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অপর একটি সূত্রের দাবি, ভারত থেকে চোরাইপথে আনা নিম্নমানের চা সিলেটে এনে স্থানীয় ভালো মানের চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে। একটি চক্র এসব ভারতীয় চাকে সিলেটের স্থানীয় চা বাগানের চা হিসেবে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু চা পাতা দেখে সেটি ভারতীয় নাকি বাংলাদেশি—তা অনেক সময় বোঝা কঠিন। চা তৈরির পর এর গুণগত মান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ফলে নিম্নমানের চা স্থানীয় ভালো মানের চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা হলে সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সিলেট নগরীর আম্বরখানার ব্যবসায়ী গুলজার আলম জানান, প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন ব্যক্তি ভারতীয় চোরাই চা বিক্রির জন্য নমুনা নিয়ে আসেন। দাম কম হলেও ক্রেতাদের স্বার্থ বিবেচনায় তিনি এসব চা দোকানে তোলেন না।
তার ভাষ্য, চোরাই চায়ে বর্তমানে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। এভাবে নিম্নমানের চা বাজারে প্রবেশ করতে থাকলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভালো মানের চায়ের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই সপ্তাহে পুলিশের হাতে ভারতীয় চায়ের তিনটি চালান ধরা পড়েছে। এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ চা পাতা উদ্ধার করা হয়েছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের মিডিয়া অফিসার ও অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. মনজুরুল আলম জানান, চা চোরাচালানের মূল হোতাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। এখন পর্যন্ত চোরাই চা পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত বাহকদের আটক করা গেলেও মূল সিন্ডিকেটকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
সীমান্ত দিয়ে চোরাইপথে নিম্নমানের ভারতীয় চায়ের প্রবেশ অব্যাহত থাকায় একদিকে যেমন ক্রেতাদের প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে, অন্যদিকে সিলেটের স্থানীয় চা শিল্পের বাজারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
