মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানোসহ গুমের বিচার কার্যকর করতে সংসদে বিভিন্ন প্রস্তাব
মানবাধিকার সুরক্ষা ও গুম প্রতিরোধে আইন আরও কার্যকর করতে জাতীয় সংসদে মোট নয়টি প্রস্তাব দিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ এবং ‘বলপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এর জনমত যাচাইয়ের সময় তিনি এসব প্রস্তাব দেন।
রুমিন ফারহানা বলেন, মানবাধিকার নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। আইনের দুর্বলতা দূর করার পাশাপাশি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা, তদন্ত সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি প্রস্তাব করেন, কমিশনের নির্দেশ অমান্যকারী কোনো ক্ষমতাবান কর্মকর্তা বা বাহিনীর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কিংবা আদালত অবমাননার মতো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা কমিশনকে দিতে হবে।
তদন্ত কার্যক্রমে পুলিশের পরিবর্তে সম্পূর্ণ স্বাধীন ফরেনসিক ও তদন্ত ক্যাডার গঠনেরও দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের আদলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নিজস্ব প্রসিকিউশন উইং ও আইনজীবী প্যানেল গঠনের প্রস্তাব দেন।
এ ছাড়া বিশেষ মানবাধিকার ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা পরিচালনার এখতিয়ার কমিশনকে দেওয়ার কথাও বলেন রুমিন ফারহানা।
ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘উইটনেস প্রটেকশন’ বা আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
তার মতে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে কার্যকর তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
‘বলপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল’ নিয়েও পাঁচটি প্রস্তাব দেন রুমিন ফারহানা।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গুমকে স্পষ্টভাবে চলমান বা অবিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। এতে অতীতে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলোর বিচার নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে তিনি মনে করেন।
কোনো নাগরিককে সর্বশেষ যে বাহিনীর হেফাজতে দেখা গেছে, ওই ব্যক্তি তাদের হেফাজতে নেই—এমন প্রমাণের প্রাথমিক দায় সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ওপর দেওয়ার প্রস্তাবও করেন তিনি।
সামরিক ও বেসামরিক বিচারব্যবস্থার মধ্যে দ্বন্দ্ব এড়াতে বিলে স্পষ্ট ‘নন-অবস্ট্যান্ট ক্লজ’ রাখার কথাও বলেন এই সংসদ সদস্য।
রুমিন ফারহানা প্রস্তাব করেন, কাউকে আটকের দুই ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজে তার আটকের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
তার মতে, এর মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বা আদালত দ্রুত কোনো ব্যক্তির আটকের বিষয়টি জানতে পারবে।
এ ছাড়া নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের হয়রানি কমাতে অভিযোগ পাওয়ার ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে অনুপস্থিতির সনদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখার প্রস্তাবও দেন তিনি।
সংসদে আলোচনার সময় রুমিন ফারহানা দাবি করেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজারের বেশি শিশুর এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, নিখোঁজ শিশুদের পরিবারের সদস্যরা সন্তানদের ফিরে পাওয়ার দাবিতে একটি সভার আয়োজন করেছেন। বিষয়টিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক উল্লেখ করে নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানো, সাক্ষীদের আইনি সুরক্ষা, গুমকে চলমান অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা, আটক ব্যক্তির তথ্য দ্রুত ডিজিটাল ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সুরক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংসদে প্রস্তাব দিয়েছেন রুমিন ফারহানা। একই সঙ্গে নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
