আচরণবিধি লঙ্ঘনে জেল-জরিমানা, গুরুতর ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগ
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন আচরণবিধি অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারের সময় ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর এবং মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করা যাবে না। বিধিমালা লঙ্ঘন করলে জেল-জরিমানার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে।
সম্প্রতি ৩ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত নতুন বিধিমালা গেজেট আকারে জারি করা হয়। ভোট কেনাবেচা এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে অর্থ লেনদেন বন্ধ করার লক্ষ্যেই সিটি করপোরেশন নির্বাচন আচরণবিধিতে এ বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে থাকা ব্যক্তি ভোটারকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ভোটারের নিজের কিংবা পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত এনআইডি নম্বর সংগ্রহ করতে পারবেন না।
একইভাবে এমএফএসের মাধ্যমে লেনদেনের উদ্দেশ্যে ভোটারের মোবাইল নম্বর সংগ্রহও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রভাব বিস্তার ও অর্থ লেনদেনের সুযোগ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০১৬ সালের আচরণবিধি বাতিল করে নতুন এই বিধিমালা করা হয়েছে। এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের এনআইডি ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহের অভিযোগ উঠলে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে শাস্তির বিষয়ে সতর্ক করেছিল ইসি। তবে এবারই প্রথম স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মূল আচরণবিধিতে বিষয়টিকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলো।
নতুন আচরণবিধি প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে প্রস্তুতি চলছে এবং সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে আচরণবিধি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
তিনি জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার রোধ, অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা এবং পরিবেশবান্ধব প্রচারণার বিষয়গুলোও নতুন বিধিমালায় যুক্ত করা হয়েছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের জন্য পৃথক আচরণবিধি জারি করা হবে।
নতুন আচরণবিধিতে নির্বাচনী প্রচারে রঙিন ও কাগজের পোস্টার ছাপানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারে সরকারি সুবিধা ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচার চালানো যাবে না।
ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন ও বিলবোর্ডের আকারও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এসব প্রচারসামগ্রী সাদা-কালো রঙের হতে হবে।
- ব্যানার: সর্বোচ্চ ১০ ফুট × ৪ ফুট
- লিফলেট ও হ্যান্ডবিল: এ-ফোর সাইজ
- ফেস্টুন: ১৮ ইঞ্চি × ২৪ ইঞ্চি
- বিলবোর্ড: সর্বোচ্চ ১৬ ফুট × ৯ ফুট
- প্রতীক: দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা সর্বোচ্চ ৬ ফুট
প্রচারসামগ্রীতে মুদ্রণের তারিখ থাকতে হবে। পলিথিনের আবরণ বা পিভিসি ব্যবহার করা যাবে না। লিফলেট বা ফেস্টুনে প্রার্থীর নিজের ছবি ও প্রতীক ছাড়া অন্য কারও ছবি বা বক্তব্য রাখার সুযোগও রাখা হয়নি।
নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘সরকারি অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’র তালিকায় নতুন কিছু পদ যুক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, বিরোধীদলীয় উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী বা সমমর্যাদার ব্যক্তি, সংসদ সদস্য ও সিটি মেয়রের পাশাপাশি এবার মেয়রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রশাসকদেরও তালিকায় রাখা হয়েছে।
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম নতুন আচরণবিধিকে আগের তুলনায় বেশি সুসংহত বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, আগের নির্বাচনে এনআইডি ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহের যে প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, সেটি সরাসরি বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় প্রার্থীরা সতর্ক হবেন এবং ইসির জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
তবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বা সচিব পদমর্যাদার রাজনৈতিক সহকারীদেরও অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকায় যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দলীয় হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর অনানুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি আচরণবিধিতে আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন তিনি।
