অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ৯ উইকেটের জয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ক্রিকেটারদের চাপমুক্ত মানসিকতা—মনে করেন জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার। তাঁর মতে, এক সেশন ভালো খেলার পর পরের সেশনেও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার যে চাপ তৈরি হয়, বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা এবার সেটিকে নিজেদের ওপর প্রভাব ফেলতে দেননি।
ডারউইন টেস্টে জয়ের পর হাবিবুলকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, দলের পারফরম্যান্সের কোন দিকটি তাঁর সবচেয়ে ভালো লেগেছে। উত্তরে তিনি মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি ক্রিকেটারদের মানসিক দৃঢ়তার কথাই সামনে আনেন।
হাবিবুল বলেন, ‘এ ধরনের ম্যাচেও চাপ থাকে। একটি সেশন আপনি ভালো খেলছেন মানে পরের সেশনে ভালো খেলার চাপ তৈরি হওয়া। টানা ভালো খেলে যাচ্ছেন মানে সেই ভালো খেলা ধরে রাখার চাপ আসা। এই টেস্টে আমাদের ক্রিকেটাররা খুব ভালো খেলেছে, তবে আমি কৃতিত্ব দেব তাদের চাপমুক্ত থাকার মানসিকতাকে। এটাই তাদের শেষ পর্যন্ত এগিয়ে রেখেছে। তারা সব সময় টেনশন ফ্রি ছিল।’
ক্রিকেটারদের মানসিক অবস্থার একটি উদাহরণও দেন প্রধান নির্বাচক। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ম্যাচের শেষ দিনের সকালে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত সামনে থাকলেও দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে বাড়তি উত্তেজনা বা উদ্বেগ দেখা যায়নি। হাবিবুল বলেন, ‘আমরা জানি, আজকের (গতকাল) দিনটা আমাদের জন্য অন্য রকম ছিল, কিছু একটা হয়ে যেতে পারে; কিন্তু ধরুন এই জায়গায় এসে যদি না পারে, সেই চাপ তো থাকতে পারে! যদি উল্টাপাল্টা কিছু ঘটে যায়! কিন্তু সকালে হোটেলে দেখলাম, খেলোয়াড়দের মধ্যে সে রকম কিছু নেই। সবাই স্বাভাবিক, আর দশটা দিনের মতোই। ওদের এই মানসিকতাটাই ভালো লেগেছে।’
অধিনায়ক নাজমুল হোসেনের কথাতেও একই ধরনের আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা গেছে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আগের টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে হার এবং এরপর তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচেও ইনিংস হারের পর কীভাবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এমন ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে নাজমুল জানিয়েছেন, আগের ব্যর্থতা দলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি।
নাজমুল বলেন, ‘জিম্বাবুয়ের ওই ম্যাচ আমাদের খেলোয়াড়দের মধ্যে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি। ওটাকে কোনো সমস্যা মনে করিনি আমরা।’
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সাফল্যের পেছনে প্রস্তুতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ম্যাচসেরা হাসান মাহমুদ জানান, সতীর্থ ও কোচদের সঙ্গে ভিডিও বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল এবং মাঠে সেটিই বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন তাঁরা।
দুই ইনিংসে ৯ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হওয়া হাসান বলেন, ‘সতীর্থ ও কোচদের সঙ্গে বসে ভিডিও বিশ্লেষণ করে আমরা আমাদের পরিকল্পনা ঠিক করেছি। মাঠে আমরা ঠিক সেটিই বাস্তবায়ন করেছি।’
নিজের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি পুরো বোলিং ইউনিটের অবদানের কথাও তুলে ধরেন হাসান। তাঁর ভাষায়, ‘সব বোলারই দারুণ ধৈর্য দেখিয়েছে। তারা সঠিক প্রক্রিয়া মেনে নির্দিষ্ট লাইন-লেংথ ধরে রেখে বোলিং করে গেছে, যার সুফল দল পেয়েছে।’
ডারউইনে এমন বড় জয়ের পরও বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস দেখা যায়নি। ম্যাচ শেষে মাঠে উদ্যাপন এবং ড্রেসিংরুমে কিছুক্ষণ আনন্দ করার পর তাঁরা হোটেলে ফিরে যান। কারণ ডারউইন টেস্টের পঞ্চম দিনের খেলা আর প্রয়োজন হয়নি; বাংলাদেশ আগেই জয় নিশ্চিত করে ফেলেছিল। ফলে গতকালই ম্যাচের ফল নির্ধারিত হওয়ায় আজ পুরো দলের ছুটি।
আগামীকাল সকালে ম্যাকাইয়ের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা বাংলাদেশ দলের। ডারউইনের জয় তাই শুধু একটি টেস্ট জয়েই সীমাবদ্ধ থাকছে না; অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এশিয়ার দলগুলোর সাফল্যের ইতিহাসেও এটি বড় একটি ঘটনা।
শ্রীলঙ্কা এখনো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারাতে পারেনি। পাকিস্তান সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জিতেছিল ১৯৯৫ সালে। এই শতাব্দীতে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারানো এশিয়ার একমাত্র দল ছিল ভারত। এবার সেই তালিকায় যোগ হলো বাংলাদেশ—তাও টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে।
