মাত্র ছয় মাসে দেশের সব সমস্যার শতভাগ সমাধান করা কঠিন হলেও সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি গত ছয় মাসে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও অর্জনের কথা তুলে ধরেন।
আজ সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং আয়োজিত ওই সভায় মাহদী আমিন বলেন, ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী একটি ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকাঠামো থেকে দেশ পুনর্গঠনের কাজ চলছে। এ পরিস্থিতিতে ছয় মাসে সব সমস্যার পূর্ণ সমাধান করা কঠিন। তবে সরকারের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীলতা রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মাহদী আমিন বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে। বিএনপির ঐতিহাসিক ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’, বিএনপির ২৭ দফা এবং যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর ৩১ দফার ভিত্তিতে ইশতেহার তৈরি হয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে নিশ্চিত করেছেন বলেও তিনি জানান।
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা জানান, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নির্বাচনী ইশতেহারের কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হয়। প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তে প্রায় ১৩ লাখ কৃষক পরিবার সরাসরি উপকৃত হয়েছে বলে তিনি জানান।
এ ছাড়া কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড এবং প্রবাসীদের সহায়তায় প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলায় এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ চালু, ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, যাজক ও বৌদ্ধ অধ্যক্ষদের সম্মানী, খাল খনন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও সরকারের উদ্যোগের তালিকায় রয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনে রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে পড়েছিল বলে দাবি করে তিনি জানান, রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছিল। বাজারে সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
তাঁর দাবি, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সময় দীর্ঘদিন পর কোনো শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটেনি।
সরকার গত ছয় মাসে বাক্স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে উচ্চ মানদণ্ড বজায় রেখেছে বলেও দাবি করেন মাহদী আমিন। তাঁর ভাষ্য, উসকানি বা অশোভন আচরণের মতো ঘটনাও ঘটলেও সরকার ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে।
মাহদী আমিন জানান, সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি। উত্তরপত্র নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অবসরপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ নিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা আগের সরকার লোপাট করেছিল। তাঁর দাবি, ২০২২ সালের পর চার বছর ধরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা তাঁদের প্রাপ্য অর্থ পাননি। বিষয়টি জানার পর প্রধানমন্ত্রী অর্থের ব্যবস্থা করেন এবং দুই দিন আগে একটি অনুষ্ঠানে প্রাথমিকভাবে ২ হাজার কোটি টাকার চেক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছে।
আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে দুটি এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি নতুন বিষয় পাঠ্যক্রমে যুক্ত করার কথা জানান তিনি। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই, প্রথম শ্রেণি থেকে স্কুলড্রেস ও ব্যাগ দেওয়ার উদ্যোগও তুলে ধরেন মাহদী আমিন।
তিনি আরও বলেন, প্রাইমারি গোল্ডকাপে ছেলে ও মেয়েসহ ২২ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং কম্পিটিশন’ আয়োজন, মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা, পর্যায়ক্রমে মিড-ডে মিল চালু এবং তৃতীয় ভাষা শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানান তিনি। তৃতীয় ভাষায় দক্ষ বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক গ্যারান্টির সুযোগ দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে বলে জানান মাহদী আমিন। সাম্প্রতিক গ্যাসসংকটের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং তা মোকাবিলায় বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনস্কেল প্রণয়নের কাজও অনেকটা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি, নতুন ‘স্পোর্টস ভিলেজ’ প্রতিষ্ঠা এবং দেশের খেলার মাঠ সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন মাহদী আমিন। জুলাই জাদুঘর চালু, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নিহতদের পরিবারের সহায়তা, আহতদের দেশে-বিদেশে চিকিৎসা এবং খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী বাড়ানোর কথাও তিনি জানান।
বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা পুনরায় চালুর জন্য আলাদা তহবিল গঠন এবং শ্রমিকদের সুরক্ষায় শ্রমবান্ধব আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
অর্থনৈতিক খাতেও সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে বলে দাবি করেন মাহদী আমিন। তাঁর ভাষ্য, ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ বাড়ানো, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কর কমানো, আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষা, রপ্তানিমুখী শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সম্প্রসারণ এবং ট্রেড ও ব্যবসার লাইসেন্স নবায়ন সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধা কমানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি অর্থ পাচারের মাধ্যমে বিদেশে যাওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেন মাহদী আমিন।
মাহদী আমিনের দাবি, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নাজুক ছিল। সেখান থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে রাজনৈতিক হয়রানিমুক্ত, জনবান্ধব ও সেবামুখী পুলিশ ও প্রশাসন গড়ে তোলার কাজ চলছে।
পুলিশ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে দেশকে অস্থিতিশীল করার যেকোনো প্রচেষ্টা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্ক রয়েছে বলে জানান।
মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পার্শ্ববর্তী দেশের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র।
পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে মাহদী আমিন বলেন, বিএনপি সরকারের মূলনীতি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তি হবে সমতা, ন্যায্যতা ও মর্যাদা—এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যে ভিআইপি সংস্কৃতি ভেঙে সাধারণ মানুষের কাতারে এসেছেন বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।
মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী ও ইসমাইল জবিউল্লাহ, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর ও জাহেদ উর রহমান, বিশেষ সহকারী এস এম জিয়া উদ্দিন হায়দার ও সাইমুম পারভেজ, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
