দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব এখন শুধু জনজীবনেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব পড়ছে শিল্প-কারখানার উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাত, মূল্যস্ফীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়াচ্ছে। ফলে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি অর্থনীতির গতি ফেরানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে দীর্ঘ সময় গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবারকে ইলেকট্রিক বা লাকড়ির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে। ব্যস্ত মানুষকে নির্ভর করতে হচ্ছে হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র লোডশেডিং। শহরের বাইরে কোথাও কোথাও ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার কথা তুলে ধরা হয়েছে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক এলাকায় পানির সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের বড় প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদনে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে ক্ষুদ্র কারখানা পর্যন্ত অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন চালাতে সমস্যায় পড়ছে। কোথাও কোথাও কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকারত্ব বাড়ছে।
উৎপাদন বন্ধ থাকলে উদ্যোক্তাদের জন্য শ্রমিকদের বেতন দেওয়া এবং ব্যাংকঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি নতুন করে ঋণখেলাপির চাপ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে ব্যাংকিং খাতেও। এভাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে পরস্পর সম্পর্কিত একটি সংকটের মধ্যে ফেলছে।
উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার পাশাপাশি পণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। একই সঙ্গে রপ্তানি আয়েও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
অর্থনৈতিক সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর সামাজিক প্রভাবও বাড়তে পারে। আয়-রোজগারের সুযোগ কমে গেলে অপরাধপ্রবণতা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো ঘটনা বাড়ার আশঙ্কা থাকে। অভাব-অনটনের কারণে পারিবারিক বিরোধ ও সহিংসতাও বাড়তে পারে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার সঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনাও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জনগণের ক্ষোভকে কেন্দ্র করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের বিরুদ্ধে কর্মসূচি ও প্রচারণা চালাতে পারে। এর ফলে রাজনৈতিক সংঘাত বাড়লে তৃতীয় কোনো শক্তি পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে—এমন আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়েছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের জন্য আগের সরকারের নীতি, দুর্নীতি ও অনিয়মকে দায়ী করে আসছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির দুর্বলতা এবং অতীতের অনিয়মের কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে—সরকারের এমন বক্তব্যও রয়েছে।
তবে সাধারণ মানুষের কাছে অতীতের দায়ের চেয়ে বর্তমান সমস্যার সমাধানই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গরমে বিদ্যুৎ না থাকা কিংবা গ্যাসের অভাবে রান্না করতে না পারার বাস্তবতায় মানুষ দ্রুত স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরে পেতে চায়। তাই সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নাগরিকদের স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধানে কয়েকটি পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা ও জ্বালানি সরবরাহে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়ানো।
- প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রেখে গ্যাস ও জ্বালানি আমদানির সুযোগ কাজে লাগানো।
- বাসাবাড়িতে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে শিল্প-কারখানায় উৎপাদনের জন্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা।
- সিএনজিচালিত যানবাহনসহ বিভিন্ন পরিবহনকে বিকল্প জ্বালানিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া।
- সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো।
- বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়াতে প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করা।
- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত চালুর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।
দীর্ঘমেয়াদে নতুন গ্যাসকূপ অনুসন্ধান ও খনন এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের দ্রুত সমাধানকে এখন অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। কারণ জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হলে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। মানুষ এখন অতীতের হিসাব নয়, তাদের দৈনন্দিন সমস্যার কার্যকর সমাধান চায়।
