মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন উচ্চতায়, ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ভিন্নমুখী বক্তব্য তেহরান ও দোহার
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে জর্ডান ও কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, জর্ডানের প্রিন্স হাসান এয়ারবেস এবং কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে পৃথক হামলা পরিচালনা করা হয়েছে। তবে হামলার ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে।
আইআরজিসির প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জর্ডানে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। ইরানের দাবি অনুযায়ী, ওই হামলায় একটি কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার এবং ড্রোন পরিচালনা-সংক্রান্ত অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
একই সময়ে কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতেও হামলার দাবি করেছে তেহরান। ইরানি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সেখানে একটি বিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র ও সামরিক কমান্ড সুবিধা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
ইরানের দাবির বিপরীতে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমার দিকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়েছে। ফলে হামলার প্রকৃত প্রভাব ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো স্বাধীন তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বা আনুষ্ঠানিক তদন্ত ছাড়া সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
এই সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করেও উদ্বেগ বাড়ছে। ইরান দাবি করেছে, কয়েকটি জাহাজ অনুমোদিত নৌপথ অনুসরণ না করায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তেহরান আরও সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বা নতুন কোনো অভিযান অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হবে। একই সঙ্গে অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত স্থাপনাগুলোও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে তারা।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। এ রুটে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হলে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি, পরিবহন ব্যয় এবং শিল্প উৎপাদনে। উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশেষভাবে এর চাপ অনুভব করতে পারে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, স্থানীয় সময় শনিবার সন্ধ্যায় হামলার ঘটনা ঘটে। তবে হামলার বিস্তারিত ফলাফল বা সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
হোয়াইট হাউসও তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো বিস্তারিত মন্তব্য করেনি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী কৌশল কী হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জল্পনা-কল্পনা বাড়ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা যদি আরও বৃদ্ধি পায়, তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্য নতুন নিরাপত্তা সংকটের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুট এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এ সংঘাতের প্রত্যক্ষ প্রভাব বহন করতে পারে।
জর্ডান ও কাতারে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের হামলার দাবি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বিপরীতমুখী তথ্যের কারণে বাস্তব চিত্র এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে।
