বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী তরুণদের মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান পাওয়ার সম্ভাবনা অন্যান্য এলাকার তুলনায় ২১ দশমিক ৭ শতাংশ কম। কর্মসংস্থানের ধরন, লিঙ্গ ও বয়সসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেয়ার পরও এ পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) পরিচালিত ‘জাস্ট ট্রানজিশন ইন বাংলাদেশ: ইকোনমিক সিকিউরিটি অ্যান্ড ট্রানজিশন সাপোর্ট ফর ইয়াং পিপল’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। মঙ্গলবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়।
গবেষণাটি ৬২৫ তরুণ শ্রমিকের ওপর পরিচালিত হয়। দেশের নয়টি জেলার কৃষি, তৈরি পোশাক (আরএমজি), নির্মাণ ও পরিবহন খাতের শ্রমিকরা এতে অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের ৪৭ শতাংশ কৃষি, ২৭ শতাংশ পরিবহন ও নির্মাণ এবং ২৫ শতাংশ আরএমজি খাতের। তাদের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৯ শতাংশ পুরুষ এবং ৪০ দশমিক ১ শতাংশ নারী।
গবেষণায় কর্মসংস্থানের মান নির্ধারণে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) চারটি সূচক ব্যবহার করা হয়েছে। পরিবহন খাতকে ভিত্তি ধরে শুধু খাতের পার্থক্য বিবেচনায় নিলে কৃষিতে মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ১৫ শতাংশ, নির্মাণে ২০ দশমিক ১ শতাংশ এবং আরএমজিতে ৭৩ দশমিক ২ শতাংশ।
তবে বয়স, আয়, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ জেলা ও জরিপের ধরনসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিলে এই ব্যবধান কমে আসে। তখন কৃষি, নির্মাণ ও আরএমজি খাতে এ সম্ভাবনার পার্থক্য দাঁড়ায় যথাক্রমে ৮ দশমিক ১, ১০ দশমিক ২ ও ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
গবেষণায় বলা হয়েছে, আরএমজি খাতে মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের তুলনামূলক সুবিধা থাকলেও এর পুরোটা ভালো কর্মপরিবেশের কারণে নয়। লিখিত চাকরির চুক্তি ও তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশের মতো বিষয়ও এতে ভূমিকা রাখছে।
তরুণদের কর্মসংস্থানের নিরাপত্তাহীনতার অন্যতম বড় কারণ অনানুষ্ঠানিকতা। ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী শ্রমিকদের ২৭ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রাথমিক পর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত। তাদের লিখিত চাকরির চুক্তি কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই।
অন্যদিকে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ আনুষ্ঠানিক কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছে। ফলে চাকরি হারানো বা কর্মক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে নতুন করে কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুতির সুযোগও সীমিত।
গবেষণায় অংশ নেয়া তরুণরা অনুদান বা নতুন ব্যবসার মূলধনের তুলনায় নগদ সহায়তা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং চাকরি খুঁজে দেয়ার সহযোগিতাকে বেশি প্রয়োজনীয় বলে মনে করেছেন।
নির্মাণ খাতের শ্রমিকদের কাছে নগদ সহায়তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আরএমজি ও পরিবহন খাতের শ্রমিকরা চাকরি খুঁজে দেয়ার সহায়তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কৃষি খাতের তরুণরা নগদ সহায়তার পাশাপাশি প্রশিক্ষণকেও গুরুত্ব দিয়েছেন।
সহায়তার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক আস্থাতেও খাতভেদে পার্থক্য রয়েছে। কৃষি খাতের শ্রমিকদের আস্থা মূলত সরকারের ওপর। আরএমজি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে নিয়োগদাতারা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবহন খাতে ইউনিয়ন ও শ্রমিক সংগঠনের ওপর আস্থা বেশি।
সানেমের গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের ঝুঁকিতে তরুণরা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও ভবিষ্যতের সবুজ অর্থনীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তারাই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। তাই তাদের জন্য শুধু নীতি প্রণয়ন না করে নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়ায় তরুণদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সানেমের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জুবায়ের হোসেন বলেন, এ রূপান্তরের ঝুঁকিতে তরুণরা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও বাংলাদেশকে আরও টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিতে তারাই বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণেই তরুণদের কেন্দ্র করে তথ্যভিত্তিক গবেষণাটি করা হয়েছে।
গবেষণাপত্রে বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোর কারণে জাস্ট ট্রানজিশনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশের ৩০ শতাংশের বেশি মানুষ ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী। তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪৫ লাখ কর্মসংস্থান রয়েছে এবং দেশের রফতানির ৮৫ শতাংশের সঙ্গে এ খাত সংশ্লিষ্ট।
এদিকে জাতীয় গ্রিডের ৯২ শতাংশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। পাশাপাশি কর্মশক্তির ৪৫ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও অনিয়মিত মৌসুমি বৃষ্টির মতো জলবায়ু ঝুঁকির প্রভাব এ খাতে রয়েছে।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, জাস্ট ট্রানজিশন এখন বৈশ্বিক ও জাতীয় উভয় পর্যায়েই অগ্রাধিকার পাচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো এবং জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণ খাতগুলোর ওপর ব্যাপক নির্ভরতার কারণে এ আলোচনায় দেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
