জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলন দমনে র্যাবের হেলিকপ্টারে এসএমজি, শটগান, গ্যাসগান ও সাউন্ড গ্রেনেড বহনের তথ্য পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৯, ২০ ও ২১ জুলাই রাজধানীর আকাশে উড্ডয়নকারী র্যাবের হেলিকপ্টারে মোট ৩ হাজার ৫৫৫টি গোলাবারুদ তোলা হয়েছিল, যার মধ্যে ১ হাজার ৫৪২টি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, হেলিকপ্টার থেকে এসএমজি ও শটগান ব্যবহার করে গুলি চালানো হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তাধীন রয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় হেলিকপ্টার ব্যবহার করে দমন-পীড়নের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনী ও র্যাবের সমন্বয়ের ভিত্তিতে ১৮ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় হেলিকপ্টার উড্ডয়ন করা হয়। এর মধ্যে ১৯, ২০ ও ২১ জুলাই অস্ত্র ও গোলাবারুদ বহন এবং ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডি ১ নম্বর এলাকায় নিজ বাসার ছাদে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন আইমান উদ্দিন (২৪) ও তাঁর ফুফু নাসিমা আক্তার (২৪)। আইমানের মা রেহেনা আক্তার জানান, ঘটনার আগে তিনি আকাশে হেলিকপ্টার উড়তে দেখেছিলেন। কয়েক মিনিট পর আইমান ও নাসিমা ছাদে গেলে গুলিবিদ্ধ হন।
আইমানের বুকের ডান পাশে গুলি লেগে শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায়। নাসিমাও গুলিবিদ্ধ হন। হাসপাতালে নেওয়ার পর ২০ জুলাই নাসিমার মৃত্যু হয়। চিকিৎসার মাধ্যমে আইমান সুস্থ হলেও এখনও মাঝেমধ্যে শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথায় ভোগেন।
রেহেনা আক্তার বলেন, “কেউ বলছে সেদিন হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হয়েছিল, কেউ বলছে ছাদ থেকে গুলি করা হয়েছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, শটগান থেকে রাবার বুলেট বা সিসার গুলি নিক্ষেপ করা হয়, গ্যাসগান থেকে ছোড়া হয় কাঁদানে গ্যাসের শেল এবং সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণের মাধ্যমে তীব্র শব্দ সৃষ্টি করে। সাধারণত শটগান, গ্যাসগান ও সাউন্ড গ্রেনেড প্রাণঘাতী না হলেও এসএমজি থেকে ছোড়া লাইভ বুলেট প্রাণঘাতী।
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা জানিয়েছে, র্যাবের দেওয়া নথি ও তথ্য বিশ্লেষণ করে হেলিকপ্টারে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয়ও শনাক্ত করা হয়েছে।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে র্যাবের হেলিকপ্টারে ১৩টি শটগান, ১৩টি গ্যাসগান ও ৪টি এসএমজি বহন করা হয়। এছাড়া ৩৪০টি সাউন্ড গ্রেনেড, শটগানের জন্য ২৬০টি, গ্যাসগানের জন্য ৫৫৮টি এবং এসএমজির জন্য ২৪০টি গোলাবারুদ তোলা হয়েছিল।
সেদিন হেলিকপ্টার থেকে ২১৮টি গ্যাসগানের গোলাবারুদ ও ১২২টি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যের ভিত্তিতে সে সময় রাজধানীর রামপুরা, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট, মোহাম্মদপুর, সাতমসজিদ রোড, চাঁন মিয়া হাউজিং, মহাখালী ও মিরপুর-১০ এলাকায় হেলিকপ্টার থেকে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
তদন্ত সূত্র জানায়, ২০ জুলাই চারটি শটগান, নয়টি গ্যাসগান ও একটি এসএমজি হেলিকপ্টারে বহন করা হয়। ওই দিন শটগানের জন্য ৮০টি, গ্যাসগানের জন্য ৬৮৪টি এবং এসএমজির জন্য ৬০টি গোলাবারুদ তোলা হয়েছিল। এছাড়া ২০০টি সাউন্ড গ্রেনেড বহন করা হয়।
এর মধ্যে ৫১২টি গ্যাসগানের গোলাবারুদ এবং ১৫২টি সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়।
সেদিন যাত্রাবাড়ী থেকে রায়েরবাগ পর্যন্ত এলাকায় হেলিকপ্টারের নিচু দিয়ে উড্ডয়ন, গুলির শব্দ, সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণ এবং কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের ঘটনা প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। রাতে উত্তরার জমজম টাওয়ার এলাকার আকাশ থেকেও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়।
তদন্তে আরও জানা গেছে, ২১ জুলাই একটি শটগান, আটটি গ্যাসগান ও একটি এসএমজি হেলিকপ্টারে বহন করা হয়। সেদিন ৪০০টি সাউন্ড গ্রেনেড, শটগানের জন্য ২০টি, গ্যাসগানের জন্য ৬৫৩টি এবং এসএমজির জন্য ৬০টি গোলাবারুদ তোলা হয়েছিল।
আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে হেলিকপ্টার থেকে ২৫৫টি গ্যাসগানের গোলাবারুদ এবং ২৮৩টি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকায় অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করতেও হেলিকপ্টার থেকে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তানভীর হাসান জোহা জানান, শুরুতে র্যাব তদন্ত সংস্থাকে জানিয়েছিল যে জরুরি পরিস্থিতির কারণে ওই সময়ের উড্ডয়নসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি। তবে তদন্তকারীরা হেলিকপ্টারের স্বল্প উচ্চতায় উড্ডয়নের কারণে বিটিএস টাওয়ারে শনাক্ত হওয়া মোবাইল ফোনের আইএমইআই তথ্য বিশ্লেষণ করে হেলিকপ্টারে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় নির্ধারণ করেন।
তিনি বলেন, পরবর্তীতে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে র্যাবের কাছ থেকে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও উড্ডয়ন-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তদন্তে ওই সময় পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালনকারী ২০ জনের বেশি ব্যক্তির নামও উদ্ধার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক এবং সংস্থাটির মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, “বিচারাধীন একটি প্রক্রিয়ার ভেতর থাকায় এ বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই। ট্রাইব্যুনাল থেকে যখন যে তথ্য চাওয়া হচ্ছে, যে চিঠি দেওয়া হচ্ছে, তাঁরা সাধ্যমতো সেটির উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছেন।”
