সুদের হার বৃদ্ধি পেলে চাপ বাড়তে পারে মূল্যবান ধাতুর বাজারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে আশাবাদী বিশ্লেষকরা
আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা ও রুপার দাম নিয়ে নতুন সতর্কবার্তা দিয়েছে বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান। প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার আরও বাড়ালে মূল্যবান ধাতুর বাজারে প্রত্যাশার চেয়েও বড় মূল্যসংশোধন দেখা যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগকারীদের সোনা থেকে সরে গিয়ে অধিক মুনাফাযোগ্য সম্পদে বিনিয়োগে উৎসাহিত করে। ফলে সোনার মতো সুদবিহীন সম্পদের চাহিদা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং বাজারে মূল্যচাপ বাড়ে।
জেপি মরগানের সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রতি আউন্স সোনার গড় মূল্য প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ডলার এবং বছরের শেষ প্রান্তিকে তা ৪ হাজার ৫০০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করতে পারে।
অথচ কয়েক সপ্তাহ আগেও প্রতিষ্ঠানটি ধারণা দিয়েছিল যে বছরের শেষ নাগাদ সোনার দাম প্রতি আউন্স ৬ হাজার ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করতে পারে। নতুন বিশ্লেষণে সেই আশাবাদী অবস্থান থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে সরে এসেছে ব্যাংকটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রত্যাশিত মাত্রায় চাহিদা তৈরি না হওয়া এবং আর্থিক বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণেই পূর্বাভাস পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে।
মূল্যসংশোধনের আশঙ্কা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দর কিছুটা শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। সর্বশেষ লেনদেনে স্পট গোল্ডের দাম ১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৭৪ ডলারের ওপরে উঠেছে।
সপ্তাহজুড়ে মূল্যবান এই ধাতুর দাম সামগ্রিকভাবে ২ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে, যা বাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়।
স্বল্পমেয়াদি অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও জেপি মরগান দীর্ঘমেয়াদে সোনার বাজার নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান ধরে রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটির ধারণা, ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা ক্রয় বৃদ্ধি এবং প্রকৃত চাহিদা সম্প্রসারণের ফলে বাজার আবারও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারে।
বিশেষ করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি সোনাকে নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে আকর্ষণীয় রাখবে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
সোনার পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর ভবিষ্যৎ মূল্য সম্পর্কেও পূর্বাভাস দিয়েছে জেপি মরগান।
তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরে রুপার গড় মূল্য প্রতি আউন্স ৬০ থেকে ৬৫ ডলারের মধ্যে অবস্থান করতে পারে। একই সময়ে প্ল্যাটিনামের দাম ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ১ হাজার ৮০০ ডলার এবং ২০২৭ সালে প্রায় ১ হাজার ৯৫০ ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে শিল্পখাতে ব্যাপক ব্যবহৃত প্যালাডিয়ামের দামও ২০২৬ সালের মধ্যে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৩৫০ ডলারের কাছাকাছি যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সোনা ও রুপার মূল্যবাজারে বড় ধরনের ওঠানামা শুধু বিনিয়োগকারীদের নয়, গয়না শিল্প, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, খনি খাত এবং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের ওপরও প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের স্বর্ণবাজার আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হওয়ায় বৈশ্বিক মূল্য পরিবর্তনের প্রভাব স্থানীয় বাজারেও পড়তে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
বিশ্ববাজারে সোনা ও রুপার দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে মূল্যবান ধাতুগুলোর প্রতি আস্থা পুরোপুরি হারাচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। স্বল্পমেয়াদে সুদের হার ও বিনিয়োগ প্রবণতা বাজারকে প্রভাবিত করলেও, ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রয় এবং বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধিই মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
