গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় দেশের শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কয়েক ঘণ্টা মেশিন বন্ধ থাকছে, আবার কোথাও দিনের বড় সময় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কিছু কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। টেক্সটাইল, ডাইং, স্পিনিং, স্টিল, গ্লাস, কাগজ ও খাদ্যপণ্যসহ গ্যাসনির্ভর বিভিন্ন শিল্পে সংকটের প্রভাব পড়েছে। এতে উৎপাদনের পাশাপাশি রপ্তানি, কর্মসংস্থান, সরবরাহ ব্যবস্থা ও নতুন বিনিয়োগও ঝুঁকিতে পড়ছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান জ্বালানি সংকটে দেশের শিল্প খাতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ প্রায় ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার অর্থনৈতিক উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। কারখানাগুলো গড়ে ৫৫ শতাংশ সক্ষমতায় চললেও দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৭৪ কোটি টাকা হতে পারে।
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এর বিপরীতে সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২ হাজার ৪২০ এমএমসিএফডিতে। ফলে দৈনিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৮০ এমএমসিএফডি। সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপও অনেক কমে গেছে। ফলে পাইপলাইনে গ্যাস থাকলেও প্রয়োজনীয় চাপের অভাবে অনেক কারখানা স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন চালাতে পারছে না।
শিল্পাঞ্চলভেদে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। নরসিংদী ও মাধবদীতে প্রায় ৮০ শতাংশ টেক্সটাইল, ডাইং ও প্রিন্টিং কারখানা গ্যাস সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। শুধু এই দুই শিল্পাঞ্চলেই দৈনিক প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। নরসিংদীতে ৩০০টির বেশি ছোট-বড় শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো কোনো এলাকায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাচ্ছে।
বিকল্প ব্যবস্থায় যেসব কারখানা চালু রয়েছে, সেগুলোর উৎপাদনও ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। হবিগঞ্জে ১৭১টি কারখানায় সম্পূর্ণ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার বেশি বলে শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাব। গাজীপুরেও প্রায় ১৮ শতাংশ কারখানা সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করেছে বলে সাম্প্রতিক তথ্য উঠে এসেছে।
কারখানা বন্ধ থাকলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংক ঋণের কিস্তি, রক্ষণাবেক্ষণ, জমি ও ভবনের খরচসহ স্থায়ী ব্যয় অব্যাহত থাকে। এর সঙ্গে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হওয়ায় উদ্যোক্তাদের আর্থিক চাপ আরও বাড়ছে।
ডিসিসিআইয়ের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, গ্যাস সংকটকে শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জাতীয় উৎপাদন ও অর্থনীতিতে। তার মতে, কারখানা কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকার অর্থ শুধু ওই সময়ের উৎপাদন ক্ষতি নয়; কাঁচামালের অপচয়, মেশিন পুনরায় চালুর ব্যয়, শ্রমঘণ্টার ক্ষতি, অর্ডার বিলম্ব এবং রপ্তানি বাজারে আস্থার সংকটও তৈরি হয়।
বর্তমান সংকটের প্রভাব নতুন বিনিয়োগেও পড়ছে। ডিসিসিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার ৮৫৭টি শিল্পের গ্যাস সংযোগের আবেদন দীর্ঘদিন ধরে অগ্রগতি না পাওয়ায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বিনিয়োগ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
অর্থাৎ গ্যাস সংকট শুধু বর্তমান উৎপাদন ব্যাহত করছে না, ভবিষ্যৎ শিল্প সম্প্রসারণও বাধাগ্রস্ত করছে।
জুলাইয়ে মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়। ওই টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। আগস্টের শুরুতে একটি ইউনিট আংশিক চালু হলেও জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস যুক্ত হচ্ছিল।
শিল্প উদ্যোক্তাদের হিসাবে, উৎপাদনের জন্য অনেক এলাকায় যেখানে ৮ পিএসআই বা তার বেশি গ্যাসের চাপ প্রয়োজন, সেখানে তা নেমে এসেছে ২ থেকে ৩ পিএসআইয়ে। ফলে বয়লার, ডাইং মেশিন, স্টিম সিস্টেমসহ বিভিন্ন গ্যাসনির্ভর যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, কম গ্যাসের চাপ শুধু উৎপাদন বন্ধ করছে না, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও কমিয়ে দিচ্ছে।
তিনি জানান, বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি খরচ প্রায় ৩৪ টাকা, যেখানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ প্রায় ১৪ থেকে ১৫ টাকা। ফলে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।
তার ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইলের দাম বাড়িয়ে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় ক্রেতাদের কাছ থেকে আদায় করা সহজ নয়। ফলে অতিরিক্ত ব্যয় উদ্যোক্তাদের মুনাফা কমিয়ে দিচ্ছে কিংবা লোকসানে ফেলছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গ্যাসের দাম বাড়ানোর পরও প্রয়োজনীয় সরবরাহ ও চাপ পাওয়া যাচ্ছে না। ২০২৫ সালে নতুন শিল্প সংযোগের গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা করা হয়। ক্যাপটিভ পাওয়ারের গ্যাসের দাম ৩১ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪২ টাকা করা হয়।
ফলে বাড়তি মূল্য পরিশোধ করেও পর্যাপ্ত চাপ না পাওয়ায় উদ্যোক্তাদের উৎপাদন ব্যয় ও ব্যবসায়িক ঝুঁকি—দুটিই বাড়ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শিল্পের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্ভরযোগ্য সরবরাহ পরিকল্পনা। শুধু সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো নয়, শিল্পাঞ্চলভিত্তিক ন্যূনতম চাপ ও সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তার মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, পাইপলাইন অবকাঠামো, এলএনজি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। গ্যাসের কম চাপের প্রভাব শুধু কারখানার হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না; শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা, কাঁচামাল ব্যবহার, পরিবহন, সরবরাহকারী, রপ্তানি আদেশ ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপরও এর প্রভাব পড়ে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকটের প্রকৃত চিত্র বুঝতে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দৈনিক উৎপাদন, গ্যাসের চাপ, বন্ধ থাকার সময় ও আর্থিক ক্ষতির তথ্য নিয়মিতভাবে সংগ্রহ করা প্রয়োজন। এতে শিল্প খাতে জ্বালানি সংকটের প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ এবং কার্যকর সমাধানের পথ বের করা সহজ হবে।
