মার্কিন বাহিনীর সর্বশেষ হামলার মধ্যেই সাম্প্রতিক সংঘাতে তৃতীয় মার্কিন সেনার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এক মাস আগে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ায় হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা বেড়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকদের ওপর হামলায় ব্যবহৃত ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্য ছিল সামরিক কমান্ড সেন্টার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র, নৌ সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ ঘাঁটি এবং যোগাযোগ অবকাঠামো।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানায়, উপসাগরীয় অঞ্চলের বন্দরনগরী বান্দার মাহশাহর ও বান্দার ইমাম খোমেইনি থেকে শুরু করে হরমুজ প্রণালির নিকটবর্তী জাস্ক ও সিরিক পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ফার্স নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, কোনারাক ও চাবাহার শহরেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়।
এ ছাড়া বুশেহর প্রদেশের খোরমুজ শহরের কাছাকাছি এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবরিজেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। আল জাজিরার তেহরান প্রতিনিধি তোহিদ আসাদি জানান, চলমান সংঘাত শুরুর পর এই প্রথম তাবরিজে হামলার ঘটনা ঘটল। গত নয় দিনে বারবার লক্ষ্যবস্তু হওয়া দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকাগুলোতেও আবার হামলা চালানো হয়েছে। এর আগে এসব অঞ্চলে সেতু, রেললাইন ও একটি বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, লোরেস্তান প্রদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনার দিকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা জর্ডান ও কুয়েতে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে বাহরাইনেও সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে।
আইআরজিসির বক্তব্য অনুযায়ী, জর্ডানের আকাবা বিমানবন্দরে অবস্থানরত মার্কিন বিমান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে এবং আজরাকের মুয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটির হ্যাঙ্গার ধ্বংস করা হয়েছে। পাশাপাশি কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনাগুলোতেও আঘাত হানার দাবি করেছে বাহিনীটি।
ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, নিহত তিন মার্কিন সেনার স্মরণে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর হামলা চালানো হচ্ছে। বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখে রাজধানীতে ফেরার পর তিনি বলেন, “We hit them very hard again tonight, and we did that in honour of the, probably three, it’s probably three great patriots।”
ট্রাম্প আরও বলেন, নিহত সেনাদের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে মর্মাহত এবং “Iran cannot have a nuclear weapon”।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, যুক্তরাষ্ট্র এখনো কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রেখেছে, তবে তা হতে হবে বাস্তবসম্মত। তিনি হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্যান্য দেশকে সরঞ্জাম বা অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে সমুদ্রপথ নিয়েও উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। ওয়াশিংটন দাবি করছে, তারা ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর করছে। অন্যদিকে তেহরান বলছে, হরমুজ প্রণালিতে তাদের নির্ধারিত নিয়ম লঙ্ঘনকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
আইআরজিসি জানিয়েছে, গত রাতে প্রণালি অতিক্রমের সময় দুটি তেলবাহী ট্যাংকার বিস্ফোরণের শিকার হয়েছে। তাদের দাবি, জাহাজ দুটি যুক্তরাষ্ট্রের চাপে একটি ‘অনিরাপদ’ করিডোর ব্যবহার করছিল।
এক বিবৃতিতে আইআরজিসি সতর্ক করে বলেছে, “রাসায়নিক সার তো দূরের কথা, তেল-গ্যাসের এক ফোঁটাও এই পথ দিয়ে নিরাপদে পরিবহন করা সম্ভব নয়।” মার্কিন সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে ওই করিডোর নিরাপদ হবে না বলেও উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, নৌ অবরোধ কার্যকর করতে রোববার ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে এবং আরেকটি জাহাজের কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংঘাতে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। নিহতদের বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের বাসিন্দা। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
