রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে যোগাযোগ ব্যাহত; আশ্রয়কেন্দ্রে বিশুদ্ধ পানির সংকট
টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় দেখা দিয়েছে বহুমাত্রিক দুর্ভোগ। পাহাড়ধস, পাহাড়ি ঢল, জলাবদ্ধতা এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের বিভিন্ন স্থানে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে, অনেক পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে এবং আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করলেও অব্যাহত বৃষ্টির কারণে নতুন করে বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অবিরাম বৃষ্টিতে নরম হয়ে যাওয়া পাহাড়ের মাটি ধসে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের কয়েকটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাঙামাটি সদর উপজেলার সাপছড়ি ইউনিয়নের ঢেপ্পোছড়ি মুখ এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনায় কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
এর ফলে সড়কের উভয় পাশে শতাধিক যানবাহন আটকা পড়ে এবং যাত্রীদের দীর্ঘ সময় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পরে সড়ক থেকে মাটি অপসারণের মাধ্যমে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালানো হয়।
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ি ঢলের পানি সড়কে উঠে যাওয়ায় স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। জরুরি প্রয়োজনেও অনেক মানুষকে বিকল্প উপায়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ডুবে যাওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন কাজে বিঘ্ন ঘটছে।
ভারী বর্ষণের কারণে বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে দুই জেলার মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক এলাকায় মানুষকে প্রয়োজনীয় কাজে যেতে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে।
পাহাড়ি ঢল ও বন্যা পরিস্থিতির কারণে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তবে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বিশুদ্ধ পানির সংকট নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বান্দরবানের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপদ পানির জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে মানুষকে। স্থানীয় প্রশাসন ও পৌরসভা ট্যাংকারের মাধ্যমে পানি সরবরাহের চেষ্টা করছে।
টানা বর্ষণে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে যাওয়ায় অনেক বসতবাড়ি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলো আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
বান্দরবানের কয়েকটি এলাকায় পাহাড়ের অংশ ধসে বসতঘরের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
দুর্যোগের মধ্যেও জরুরি চিকিৎসা ও উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থা। লোহাগাড়ার একটি পানিবন্দী এলাকায় প্রসব বেদনায় আক্রান্ত এক নারীকে উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সে পৌঁছে দেওয়ার ঘটনা মানবিক সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টির কারণে কৃষি, পরিবহন ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে পরিকল্পিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থানান্তর এবং উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা না গেলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।
পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ি ঢলে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের বহু এলাকা এখনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
