পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা বড় আকারের গ্রহাণুর সম্ভাব্য আঘাত প্রতিহত করতে নতুন একটি কৌশলের কথা জানিয়েছেন চীনের বিজ্ঞানীরা। তাঁদের গবেষণা অনুযায়ী, গ্রহাণুর অভ্যন্তরে পারমাণবিক বিস্ফোরক স্থাপন করে বিস্ফোরণ ঘটানো হলে সেটির গতিপথ সবচেয়ে কার্যকরভাবে পরিবর্তন করা বা প্রয়োজন হলে ধ্বংস করা সম্ভব হতে পারে।
মানবসভ্যতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত গ্রহাণুর ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন এই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘স্পেস: সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ সাময়িকীতে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন চায়না একাডেমি অব লঞ্চ ভেহিকেল টেকনোলজির বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানীরা জানান, অতীতেও পৃথিবীতে বড় গ্রহাণুর আঘাতে ব্যাপক পরিবেশগত পরিবর্তন হয়েছে এবং বহু প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীর কাছাকাছি থাকা অনেক বড় গ্রহাণু এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভাব্য সংঘর্ষের সতর্কবার্তা মাত্র কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ আগে পাওয়া যায়।
বর্তমানে নাসার ডার্ট (DART) মিশনের মতো প্রযুক্তি গ্রহাণুর গতিপথ পরিবর্তনে সফল হলেও, কয়েক শ মিটার ব্যাসের বিশাল গ্রহাণুর ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যে এসব পদ্ধতি যথেষ্ট কার্যকর নাও হতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকদের প্রস্তাবিত কৌশলে প্রথমে একটি মহাকাশযান গ্রহাণুর গভীরে বিশেষ ভেদকারী যন্ত্র দিয়ে গর্ত তৈরি করবে। এরপর সেই গর্তে পারমাণবিক বিস্ফোরক স্থাপন করে বিস্ফোরণ ঘটানো হবে।
এই ধারণা যাচাই করতে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের কম্পিউটার সিমুলেশন পরিচালনা করেন। সেখানে বিস্ফোরণের শক্তি, বিস্ফোরক স্থাপনের গভীরতা, উৎক্ষেপণযানের বৈশিষ্ট্য এবং সংঘর্ষের গতি—সবকিছু বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, হিরোশিমায় নিক্ষেপ করা পারমাণবিক বোমার তুলনায় প্রায় ২০০ গুণ শক্তিশালী বিস্ফোরণ প্রায় ১০০ মিটার ব্যাসের একটি গ্রহাণুকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলতে সক্ষম হতে পারে।
এ ছাড়া দেখা গেছে, গ্রহাণুর পৃষ্ঠের প্রায় ৩০ মিটার গভীরে বিস্ফোরক স্থাপন করে বিস্ফোরণ ঘটানো হলে অগভীর স্থানে বিস্ফোরণের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি কার্যকরভাবে এর গতিপথ পরিবর্তন করা সম্ভব।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১ কিলোমিটার ব্যাসের একটি গ্রহাণুর ২০ মিটার গভীরে বিস্ফোরণ ঘটানো হলে সেটির পৃথিবী থেকে সরে যাওয়ার গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩০ সেন্টিমিটারেরও বেশি বাড়ানো যেতে পারে।
গবেষকদের মতে, পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা বড় গ্রহাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা তৈরিতে এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে কোনো সম্ভাব্য সংঘর্ষের আগে সময় খুব কম থাকলে, গ্রহাণুর গতিপথ বদলাতে বা সেটিকে ধ্বংস করতে পারমাণবিক বিস্ফোরণ সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, পৃথিবীর নিকটবর্তী বৃহৎ গ্রহাণুর বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রকৌশলগত নকশা তৈরিতে এই গবেষণা প্রয়োজনীয় তথ্য ও দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।
