বিহার, গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশের সাম্প্রতিক তিনটি বিধানসভা উপনির্বাচনের ফলাফল ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিহারের বাঁকিপুরে দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হারানো এবং গুজরাটে জয়ের ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়াকে দলটির জন্য সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে তরুণ ভোটারদের মনোভাব ও দলীয় অসন্তোষও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উপনির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতাসীন দলই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে। সে বিবেচনায় বিহারের বাঁকিপুর আসনে বিজেপির পরাজয় বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আসনটি দলটির নিয়ন্ত্রণে ছিল। এমনকি ভোটের আগে স্থানীয় বিজেপি নেতা রবিশঙ্কর প্রসাদ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন, প্রার্থী যেই হোক না কেন, দলটি জয়ী হবে।
দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন ভোটের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাঁকিপুরে প্রচারে নিতে চেয়েছিলেন। যদিও প্রধানমন্ত্রী এতে সম্মতি দেননি। সাধারণত তিনি উপনির্বাচনের প্রচারে অংশ নেন না। তবে এই অনুরোধ থেকেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে আসনটির পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা উদ্বেগের ইঙ্গিত পৌঁছেছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
মাত্র আট মাস আগে বিহার বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি-জেডিইউ নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। ২৪৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি একাই ৮৯টি আসনে জয়ী হয়েছিল এবং পরে দলটি প্রথমবারের মতো মুখ্যমন্ত্রীর পদও নিজেদের দখলে নেয়।
বাঁকিপুরে জন সুরাজ পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রশান্ত কিশোরের জয়কে বিশ্লেষকেরা অন্যতম বড় চমক হিসেবে দেখছেন। গত বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দলের ভোটের হার ছিল সাড়ে ৩ শতাংশেরও কম এবং কোনো আসনেই জয় পায়নি। কিন্তু এবার তিনি প্রায় ৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজেপি প্রার্থী নীরজ কুমার সিনহাকে ১৯ হাজার ৩২৪ ভোটে পরাজিত করেন। অন্যদিকে বিজেপির ভোটের হার নেমে আসে প্রায় ৩৪ শতাংশে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত নির্বাচনে বিজেপি যে আসনে প্রায় ৫২ হাজার ভোটের ব্যবধানে জিতেছিল, সেখানে এত অল্প সময়ের ব্যবধানে এমন ফলাফল রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শুধু বিহার নয়, গুজরাটের মঞ্জলপুর আসনেও বিজেপি জয় পেলেও ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগের নির্বাচনে দলটি প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হলেও এবার সেই ব্যবধান নেমে আসে প্রায় ৩০ হাজার ভোটে। অর্থাৎ ব্যবধান কমেছে প্রায় ৭২ হাজার ভোট।
অন্যদিকে মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া আসনে দলীয় কোন্দল ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের মধ্যেও কংগ্রেস প্রার্থী ঘনশ্যাম সিং প্রায় ৬ হাজার ভোটে জয় পান। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিজেপির সাবেক নেতা নরোত্তম মিশ্রর প্রকাশ্য অসন্তোষও এ ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী আন্দোলন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের সক্রিয় অবস্থান এই উপনির্বাচনগুলোতে প্রভাব ফেলেছে। বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থার নানা সমস্যা ও অর্থনৈতিক চাপের মতো বিষয়গুলোতে তরুণদের ক্ষোভ বিজেপিবিরোধী ভোটে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মত দেওয়া হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত না থেকেও তরুণ ভোটারদের একটি অংশ এমন প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছে, যাঁদের বিজেপিকে পরাজিত করার সম্ভাবনা ছিল। ফলে তারা নির্বাচনী ফলাফলে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপনির্বাচনের ফলের পর বিজেপি নেতৃত্ব তরুণ ভোটারদের আস্থা পুনরুদ্ধারে উদ্যোগী হওয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রদেশে নরোত্তম মিশ্রর প্রকাশ্য বিদ্রোহকে দলীয় শৃঙ্খলার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকের মতে, বিরোধী দলগুলো ইতোমধ্যে দাবি করতে শুরু করেছে যে এই উপনির্বাচনের ফল বিজেপির দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্যে পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। যদিও সেটি বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের বৃহত্তর নির্বাচনী লড়াই এবং ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক কৌশলের ওপর।
১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করা নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহর নেতৃত্বের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিবর্তিত জনমত ও তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশার সঙ্গে নিজেদের নতুনভাবে মানিয়ে নেওয়া।
