দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে গিয়ে অনেকেই ভালো মানের চা–পাতা কিনতে চান। তবে অসংখ্য দোকান ও আকর্ষণীয় মোড়কের ভিড়ে আসল ও মানসম্মত চা বেছে নেওয়া সহজ নয়। দীর্ঘদিন ধরে চা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, সঠিক দোকান নির্বাচন এবং কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখলেই প্রতারণা এড়িয়ে উন্নত মানের চা কেনা সম্ভব।
শ্রীমঙ্গলের স্টেশন রোড দীর্ঘদিন ধরেই মানসম্মত চা–পাতার অন্যতম প্রধান বাজার হিসেবে পরিচিত। এখানকার পুরোনো ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা জানান, চা কেনার ক্ষেত্রে শুধু বাহ্যিক চাকচিক্য নয়, বরং বিক্রেতার বিশ্বাসযোগ্যতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
স্টেশন রোডের অন্যতম পুরোনো প্রতিষ্ঠান গ্রীন লিফ টি ১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করে। বর্তমান স্বত্বাধিকারী গণেশরঞ্জন রায় জানান, তাঁর নানার হাত ধরে ব্যবসার সূচনা হয়। পরে মামা কৃষ্ণ সেন চৌধুরী দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১৭ সাল থেকে তিনি প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন। বর্তমানে পরিবারের অন্য সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে থাকলেও আসল ও মানসম্মত চায়ের খোঁজে এখনো বহু ক্রেতা এখানে আসেন।
দুই বছর পর প্রতিষ্ঠিত গুপ্ত টি হাউস–এর স্বত্বাধিকারী পীযূষকান্তি দাশগুপ্ত বলেন, তাঁদের পরিবার ব্রিটিশ আমল থেকেই চা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর ভাষায়,
“সেই ব্রিটিশ আমল থেকে চা ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের সঙ্গে জড়িত আমার দাদা, বাবা। আর তৃতীয় প্রজন্মে আমি আছি চা বিক্রির ব্যবসায়।”
তিনি জানান, চা একটি কৃষিজাত পণ্য হওয়ায় আবহাওয়া ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপর এর মান নির্ভর করে। অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা গন্ধ ও চেহারা দেখে অনেকটাই চায়ের গুণগত মান নির্ণয় করতে পারেন, যা সাধারণ ক্রেতার পক্ষে সহজ নয়।
অন্যদিকে মোস্তাক টি হাউস–এর স্বত্বাধিকারী রোমান আহমেদের মতে, চা–পাতার রং বা দানার আকার দেখে ভালো-মন্দ বিচার করা কঠিন। তবে চায়ের সুগন্ধ অনেক সময় এর মান সম্পর্কে ধারণা দেয়।
চা ব্যবসায়ীদের মতে, শ্রীমঙ্গলে মানসম্মত চা কিনতে হলে নিচের বিষয়গুলো অনুসরণ করা উচিত—
১. পর্যটনকেন্দ্র থেকে চা না কেনাই ভালো
মাধবকুণ্ড, জাফলং বা বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রের দোকান থেকে চা কেনার পরিবর্তে শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্যবাহী বাজারের পুরোনো দোকানগুলো বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
২. স্টেশন রোডের স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্য নিন
কোন দোকান দীর্ঘদিনের এবং বিশ্বস্ত—এ তথ্য চা বিক্রেতাদের পরিবর্তে আশপাশের অন্যান্য স্থানীয় দোকানদারদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া ভালো।
৩. চালকদের সুপারিশে নির্ভর করবেন না
রিকশা, টমটম বা সিএনজিচালিত অটোরিকশার অনেক চালক কমিশনের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট দোকানে ক্রেতা নিয়ে যান। তাই তাঁদের পরামর্শে চা কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
৪. অভিজ্ঞ পরিচিতদের পরামর্শ নিন
আগে যাঁরা শ্রীমঙ্গল থেকে চা কিনেছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও সুপারিশ কাজে লাগালে ভালো মানের চা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
৫. আকর্ষণীয় প্যাকেট দেখে বিভ্রান্ত হবেন না
চকচকে মোড়ক বা দৃষ্টিনন্দন প্যাকেজিং মানেই ভালো চা নয়। বরং শ্রীমঙ্গলের অনেক বিশ্বস্ত দোকানে সাধারণ স্বচ্ছ পলিব্যাগেই উন্নত মানের চা বিক্রি করা হয়।
৬. শুধু ‘ফিক্সড প্রাইস’ লেখা দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না
অনেক পর্যটনকেন্দ্রেও নির্দিষ্ট মূল্য লেখা থাকলেও সেখানে নিম্নমানের চা বেশি দামে বিক্রি হতে পারে। তাই সঠিক দোকান নির্বাচনই গুরুত্বপূর্ণ।
৭. বাগান থেকে সরাসরি চা কেনার ধারণা ভুল
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমল থেকেই চা–বাগান থেকে সরাসরি চা বিক্রির ব্যবস্থা নেই। তাই বাগান থেকে সরাসরি চা কেনার দাবি বিশ্বাস না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
৮. অপরিচিত অনলাইন পেজ এড়িয়ে চলুন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখে চা কেনার পরিবর্তে বিশ্বস্ত ও পরিচিত প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করার পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বর্তমানে শ্রীমঙ্গলের বাজারে বিভিন্ন ধরনের চা–পাতার দাম—
- ক্লোন টি: প্রতি কেজি ৩২০–৩৬০ টাকা
- বিটি–২: ৪০০ টাকা
- টি গোল্ড: ৫০০ টাকা
- প্রিমিয়াম টি গোল্ড: ৮০০ টাকা
- ফিনলে গ্রিন টি: ৭০০ টাকা
- এনটিসি গ্রিন টি: ২,৫০০ টাকা
- বিটিআরআই গ্রিন টি: ৩,০০০ টাকা
চা–পাতা কেজি, আধা কেজি এবং ২৫০ গ্রাম প্যাকেটেও কেনা যায়।
চা দীর্ঘদিন সুগন্ধ ও মান অক্ষুণ্ন রাখতে মুখবন্ধ এয়ারটাইট টিন বা কাচের পাত্রে সংরক্ষণ করা উচিত। পাশাপাশি আর্দ্রতা ও সরাসরি তীব্র আলো থেকে দূরে রাখলে চায়ের গুণগত মান দীর্ঘদিন বজায় থাকে।
