দুই বছরের চোটের ধাক্কায় ক্রিকেট থেকে দূরে ছিলেন রোহান উদ দৌলা। সেই দীর্ঘ বিরতির পর ফিরে এখন পারফরম্যান্সে নিজের সামর্থ্যের জানান দিচ্ছেন ২১ বছর বয়সী এই পেসার। দক্ষিণ আফ্রিকা ইমার্জিং দলের বিপক্ষে সর্বশেষ লিস্ট ‘এ’ ম্যাচে পাঁচ উইকেট নিয়ে আলোচনায় আসা রোহানের লক্ষ্য এখন জাতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়া। বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের সোনালি সময়ে নিজেকে ‘হীরা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান তিনি।
সৈয়দপুরের ৬ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার রোহানের গড়ন ছিল তুলনামূলক হালকা। এর মধ্যে স্ট্রেস ফ্র্যাকচারে আক্রান্ত হয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট পেরিয়ে পেশাদার ক্রিকেটে প্রবেশের আগেই প্রায় দুই বছর মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাঁকে। সেই সময়ে ঢাকার ব্যস্ততার চেয়ে সৈয়দপুরের পরিবেশই হয়ে উঠেছিল তাঁর আশ্রয়।
সেই সময়ের কথা মনে করে রোহান বলেন, ‘ওই দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। আমার বাড়ি তো উত্তরে, ওদিকে সুন্দর ঠান্ডা থাকে। ভোর ছয়টায় ঘুম থেকে উঠে হেঁটে বেড়াতাম একা একা। কোনো দিন সাইকেল চালাতে চালাতে গান শুনতাম। এভাবেই প্রায় দুই বছর কেটে গেছে।’
দীর্ঘ সময় ক্রিকেটের বাইরে থাকার পর তাঁর ক্যারিয়ার থেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। তবে রোহানের নিজের মধ্যে সে ভয় ছিল না। বরং ফিরে এসে আবার পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নিজের জায়গা তৈরি করছেন তিনি।
দক্ষিণ আফ্রিকা ইমার্জিং দলের বিপক্ষে সর্বশেষ লিস্ট ‘এ’ ম্যাচে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন রোহান। তাঁর পাঁচ শিকারের চারটিই ছিল বোল্ড। একপর্যায়ে টানা তিন বলে তিন উইকেটও পেয়েছিলেন। মাঝখানে একটি ওয়াইড হওয়ায় হ্যাটট্রিক অবশ্য পূর্ণ হয়নি।
দুই বছরের বিরতিকে রোহান দেখছেন ভিন্নভাবে। তাঁর ভাষায়, ‘মুভি দেখতে গিয়ে পজ করলে যেমন হয়, আমার কাছে এই সময়টা তেমনই। ওই পজটা এখন আবার আনপজ করেছি। আগে যা যা চাইতাম, যেমন ক্ষুধা ছিল, সব একই রকম আছে, কিছুই বদলায়নি।’
এই সময়ে মায়ের কথাও তাঁকে মানসিকভাবে শক্তি দিয়েছে। ‘ধরো তুমি দুই বছর পর ক্রিকেট শুরু করেছ’—মায়ের এই সান্ত্বনা ও উৎসাহ তাঁকে লড়াই চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
রোহানের পেসে গতি আছে, উচ্চতা আছে; পাশাপাশি বল সুইং করানোর সামর্থ্যও রয়েছে। বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ে তাসকিন আহমেদ, নাহিদ রানা ও শরীফুল ইসলামের সময়েই তাই নতুন করে নিজের জায়গা তৈরি করতে চান তিনি।
তবে প্রতিযোগিতা কঠিন—এ কথা তাঁকে মনে করিয়ে দেওয়া হলে রোহানের উত্তর, ‘ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে তো লাভ নেই। আগে আমাদের দেশে ফাঁকা মাঠ ছিল। এখন তা নেই। এটা তো ভালো!’
বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের বর্তমান সময়কে সোনালি যুগ বলা হলে রোহান নিজেই প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি হীরা নেবেন নাকি সোনা?’ এরপর নিজের লক্ষ্য স্পষ্ট করে বলেন, ‘অবশ্যই হীরা নেবেন। আমি হীরা হতে চাই। স্বর্ণযুগ চলুক, আমি যদি হীরা হই, আমাকেই আগে নেবে। আমাকে হীরা হতে হবে।’
হয়ে উঠতে চাওয়া সেই ‘হীরা’র পথ অবশ্য সহজ নয়। টেপ টেনিস ক্রিকেট দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর একটি একাডেমিতে ক্রিকেট শেখার সুযোগ পান। এলাকার বড় ভাইয়েরা তাঁর প্রতিভার কথা মা-বাবাকে বলায় পড়াশোনার পাশাপাশি ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়ার সুযোগও পান তিনি।
বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের ধাপ পেরিয়ে এরই মধ্যে জাতীয় দলের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন রোহান। তবে কখন জাতীয় দলে সুযোগ পাবেন, সেই উত্তর তাঁর জানা নেই। লক্ষ্য সম্পর্কে অবশ্য কোনো সংশয় নেই তাঁর। রোহান বলেন, ‘আমাকে হীরা হতেই হবে ভাই, যদি না পারি ওই আফসোস সারা জীবন থেকে যাব। আমি তা নিয়ে বাঁচতে চাই না। হীরা হতে যা যা করা লাগে, সবকিছুর জন্যই আমি প্রস্তুত।’
দুই বছর আগেই বিপিএলে খেলা এই পেসারের স্বীকৃত ক্রিকেটে অভিজ্ঞতা এখনো সীমিত—১১টি লিস্ট ‘এ’ এবং দুটি স্বীকৃত টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। তবে দক্ষিণ আফ্রিকায় চলমান ট্রাই সিরিজে তাঁর ক্যারিয়ার নতুন করে গতি পেয়েছে। এই সিরিজের পর অস্ট্রেলিয়ার টপ এন্ড টি-টোয়েন্টিতে খেলার কথা রয়েছে তাঁর। এরপর কোথায় সুযোগ আসে, তা সময়ই বলে দেবে।
দীর্ঘ চোটের অভিজ্ঞতা রোহানের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এনেছে। তিনি বলেন, ‘এখন আমার খারাপ হলেও কিছু যায়–আসে না, ভালো হলেও না। কারণ, আমি জানি যেখান থেকে কষ্ট আসবে, ওখান থেকেই সুখ আসবে।’
কোনো একজন ক্রিকেটারকে আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করেন না রোহান। তবে গতির জন্য যশপ্রীত বুমরা এবং সুইংয়ের জন্য ভুবনেশ্বর কুমার তাঁর পছন্দের বোলার। দুজনেরই চোটের সঙ্গে লড়াই করে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
রোহানের সামনে এখন নিজেকে প্রমাণ করার দীর্ঘ পথ। তাঁর নিজের ভাষায়, এই পথচলায় সবচেয়ে বড় শক্তি ‘ক্যারেক্টার’ ও ‘মানসিক শক্তি’। জাতীয় দলের দরজা তাঁর জন্য কবে খুলবে, তা অনিশ্চিত হলেও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে সেই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতই দিচ্ছেন এই তরুণ পেসার।
