স্কুলে যেতে না পারা, বমি বা অজ্ঞান হওয়ার মতো উপসর্গ হলে প্রয়োজন দ্রুত চিকিৎসা
একজন কিশোরীর প্রথম মাসিক বা ঋতুস্রাব তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের সূচনা করে। মাসিকের শুরুতে হালকা পেটব্যথা বা অস্বস্তি স্বাভাবিক হলেও, যদি ব্যথা এতটাই তীব্র হয় যে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়, তাহলে সেটিকে সাধারণ বিষয় হিসেবে এড়িয়ে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসকদের মতে, প্রথম কয়েকটি মাসিকের সময় সামান্য ক্র্যাম্প বা পেটব্যথা স্বাভাবিক। তবে ব্যথার কারণে স্কুলে যেতে না পারা, বমি হওয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা বারবার ব্যথানাশক ওষুধের প্রয়োজন হলে তা কোনো অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্যসমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিশোরীদের মাসিকের সময় ব্যথার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো প্রাইমারি ডিসমেনোরিয়া।
এ অবস্থায় শরীরে ‘প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন’ নামক হরমোন-সদৃশ রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয়, যা জরায়ুকে সংকুচিত করে। এই সংকোচনের ফলে সাময়িকভাবে রক্তপ্রবাহ কমে যায় এবং পেটব্যথা বা ক্র্যাম্প অনুভূত হয়।
সাধারণত এ ধরনের ব্যথা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে—
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ
- গরম সেঁক বা হিটিং প্যাড
- নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম
- পর্যাপ্ত পানি পান
- মানসিক সমর্থন ও আশ্বস্ত করা
চিকিৎসকদের মতে, প্রথম মাসিক থেকেই অত্যন্ত তীব্র ব্যথা শুরু হলে তা কিছু জটিল শারীরিক সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
কিছু কিশোরী জন্মগতভাবে এমন কিছু শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে, যা মাসিকের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- ইমপারফোরেট হাইমেন
- ট্রান্সভার্স ভ্যাজাইনাল সেপটাম
এসব অবস্থায় মাসিকের রক্ত স্বাভাবিকভাবে বের হতে না পারায় তীব্র তলপেটের ব্যথা দেখা দিতে পারে।
যদিও এন্ডোমেট্রিওসিস সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের রোগ হিসেবে পরিচিত, তবে এটি কিশোরীদের মধ্যেও দেখা যেতে পারে।
এ রোগে জরায়ুর ভেতরের আবরণের মতো টিস্যু জরায়ুর বাইরে বৃদ্ধি পায়, যার ফলে—
- তীব্র মাসিকের ব্যথা
- দীর্ঘস্থায়ী পেলভিক ব্যথা
- প্রচলিত চিকিৎসায় উপশম না হওয়া ব্যথা
দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো রোগ শনাক্ত না হলে ভবিষ্যতে প্রজননস্বাস্থ্য ও জীবনমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন—
- তীব্র তলপেট বা পেলভিক ব্যথা
- অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ
- বমি
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
- জ্বর
- প্রস্রাবের সময় ব্যথা
- মলত্যাগের সময় ব্যথা
- ব্যথার কারণে স্কুল, খেলাধুলা বা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হওয়া
এসব উপসর্গকে শুধু ‘বড় হওয়ার অংশ’ হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয় বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
মাসিকজনিত তীব্র ব্যথার কারণ খুঁজে বের করতে চিকিৎসকরা সাধারণত—
- রোগীর বিস্তারিত স্বাস্থ্য ইতিহাস
- প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা
- পেলভিক আল্ট্রাসনোগ্রাম
করার পরামর্শ দেন।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব পরীক্ষার মাধ্যমেই সমস্যার উৎস শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক কিশোরী মাসিক নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে সংকোচবোধ করে। তাই অভিভাবকদের উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সন্তান নির্ভয়ে নিজের শারীরিক সমস্যার কথা বলতে পারে।
মাসিকের তীব্র ব্যথাকে স্বাভাবিক ভেবে উপেক্ষা না করে সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ করলে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
প্রথম মাসিকে হালকা ব্যথা স্বাভাবিক হলেও তীব্র ব্যথা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বমি বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের মতো উপসর্গকে অবহেলা করা উচিত নয়। চিকিৎসকদের মতে, দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক জটিল সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা সম্ভব, যা ভবিষ্যতের প্রজননস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
