জ্বর কমলেও বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা অবহেলা না করার পরামর্শ
ডেঙ্গু সাধারণত উচ্চ জ্বর, তীব্র শরীরব্যথা, মাথাব্যথা, ত্বকে র্যাশ এবং প্লাটিলেট কমে যাওয়ার মতো উপসর্গের জন্য পরিচিত। তবে চিকিৎসকদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে এই ভাইরাস হৃদযন্ত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে, যা সময়মতো শনাক্ত না হলে গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগী সঠিক চিকিৎসা ও বিশ্রামের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠলেও অল্পসংখ্যক রোগীর হৃদযন্ত্র-সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে গুরুতর ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তি, বয়স্ক রোগী এবং আগে থেকেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বা হৃদরোগে ভোগা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু ভাইরাস এবং শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া কখনও কখনও হৃদপেশিতে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। এই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘মায়োকার্ডাইটিস’ বলা হয়।
এ ছাড়া হৃদযন্ত্রের বাইরের আবরণে প্রদাহ (পেরিকার্ডাইটিস), রক্তনালিতে তরল লিকেজ, নিম্ন রক্তচাপ, ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা এবং হৃদযন্ত্রে রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
এসব কারণে হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে কিংবা হৃদস্পন্দনের ছন্দে পরিবর্তন ঘটতে পারে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে হৃদযন্ত্রের জটিলতা অনেক সময় খুবই মৃদু হতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে রোগী নিজে কোনো উপসর্গ টের পান না এবং ইসিজি পরীক্ষার মাধ্যমে সমস্যা ধরা পড়ে।
তবে সাধারণত নিচের পরিবর্তনগুলো দেখা যেতে পারে—
- হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে ধীর হওয়া (ব্র্যাডিকার্ডিয়া)
- হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে যাওয়া
- অনিয়মিত হৃদস্পন্দন
- ইসিজিতে অস্বাভাবিকতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তন সাময়িক হয় এবং ডেঙ্গু সেরে গেলে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু রোগীর কিছু উপসর্গকে সাধারণ দুর্বলতা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন—
- বুকে ব্যথা
- শ্বাসকষ্ট
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
- হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত বা ধীর হওয়া
- বারবার বুক ধড়ফড় করা
- শরীর ফুলে যাওয়া
- অতিরিক্ত দুর্বলতা
- ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে ত্বক
- বিভ্রান্তি বা মানসিক অসংলগ্নতা
- প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া
- মাথা ঘোরা বৃদ্ধি পাওয়া
বিশেষ করে প্রবীণ ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এসব লক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা সাধারণত নিয়মিত রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন, শরীরের তরলের ভারসাম্য, প্লাটিলেট সংখ্যা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক পর্যবেক্ষণ করেন।
হৃদযন্ত্রে সমস্যা সন্দেহ হলে ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম বা বিশেষ রক্তপরীক্ষার মাধ্যমে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে হৃদযন্ত্র কতটা কার্যকরভাবে কাজ করছে তা নির্ণয় করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন করা উচিত নয়।
বিশেষ করে অ্যাসপিরিন ও আইবুপ্রোফেন জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।
সাধারণত জ্বর ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণে প্যারাসিটামলকে তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুজনিত হৃদরোগসহ সব ধরনের জটিলতা এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ডেঙ্গু সংক্রমণ প্রতিরোধ করা।
বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ, পানির পাত্র ঢেকে রাখা, মশার প্রতিরোধক ব্যবহার এবং শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরার মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
ডেঙ্গু শুধু জ্বরের রোগ নয়; কিছু ক্ষেত্রে এটি হৃদযন্ত্রসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই জ্বর কমে গেলেও বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন বা অতিরিক্ত দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। সময়মতো শনাক্তকরণ ও সঠিক চিকিৎসাই গুরুতর জটিলতা প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
