বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। সোমবার রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে ‘চাইল্ড, নট ব্রাইড’ ক্যাম্পেইনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
মাহ্দী আমিন বলেন, বাংলাদেশকে সত্যিকারের সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর করতে হলে মায়েদের, বোনদের ও কন্যাদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কন্যারা মর্যাদা ও সম্মান পাবে। একই সঙ্গে তাদের ক্ষমতায়ন ও মেধার বিকাশকে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম অগ্রাধিকার দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হ্যাকন অ্যারাল্ড গুলব্রানসেন। নরওয়ের সম্প্রচারমাধ্যম এনআরকের টেলিথনের অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের সহযোগিতায় বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। অনুষ্ঠানে সরকারি প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী, কূটনীতিক, জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যমকর্মী ও ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতারা অংশ নেন।
বাল্যবিবাহের কারণ ও বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দারিদ্র্য, সামাজিক চাপ এবং স্কুল থেকে ঝরে পড়ার কারণে বাল্যবিবাহের হার বাড়ে। যে বয়সে একটি কন্যার স্কুলে থাকার কথা, সেই বয়সে তাকে বিয়ের কাগজে স্বাক্ষর করতে হচ্ছে। তার মতে, এটি আইনগতভাবে ভুল এবং শিশুর শৈশব ও অধিকারের পরিপন্থী।
দারিদ্র্যের কারণে কোনো শিশুর কৈশোর ও শিক্ষাজীবন যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
মেয়েদের সাফল্যের প্রসঙ্গ তুলে মাহ্দী আমিন বলেন, এবারের এসএসসি পরীক্ষায় মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ভালো ফল করেছে। প্রশাসন, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা সফলভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, মেয়েদের পরিবারের বোঝা হিসেবে নয়, সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে সামাজিক সংস্কার প্রয়োজন।
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে মাহ্দী আমিন জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে মেয়েদের দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার তা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নারীর সমৃদ্ধিকে সরকারের বড় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন বলেও জানান তিনি।
মায়েদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সরকার ‘পরিবার কার্ড’ চালু করেছে বলেও জানান মাহ্দী আমিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সম্মানী দেয়া হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি শুরু করেছে। পাশাপাশি স্কুলের পোশাক ও ব্যাগ দেয়া হচ্ছে, যাতে মেয়েদের স্কুলমুখী হওয়ার হার বাড়ে।
স্কুল থেকে যারা ঝরে পড়ছে, তাদের তালিকা তৈরি করে সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়। এ সময় ‘চাইল্ড, নট ব্রাইড’ ক্যাম্পেইনের সচেতনতামূলক তিনটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন মাহ্দী আমিন। গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ সব অংশীজনকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, বাল্যবিবাহের কোনো স্থান থাকবে না—এমন নৈতিক শিক্ষা ও সচেতনতা গড়ে তুলতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার নীতি নির্ধারণের পর্যায় থেকে সহযোগিতা করবে বলেও জানান তিনি।
