বিডা, বেজা ও পিপিপির কার্যক্রম একীভূত করে গড়ে উঠছে সমন্বিত বিনিয়োগ কাঠামো
দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আরও শক্তিশালী করতে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করার লক্ষ্যে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। নতুন এই আইনের আওতায় বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট প্রধান সরকারি সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সমন্বিত করা হবে, যার ফলে বিনিয়োগ অনুমোদন, নিবন্ধন, লাইসেন্সিং এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে বলে আশা করছে সরকার।
বৃহস্পতিবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ১২তম বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে উত্থাপিত প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়।
প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের (পিপিপিএ) কার্যক্রম একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হবে। এর মাধ্যমে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ দেশের কেন্দ্রীয় বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
সরকারের মতে, নতুন ব্যবস্থার ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিভিন্ন সংস্থার দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন কমে আসবে এবং একই প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে।
নতুন আইনে সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, ডিজিটাল লাইসেন্সিং এবং অনুমোদন ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে আনার উদ্যোগও রাখা হয়েছে।
এছাড়া দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে আইনের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক অঞ্চল, মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল এবং ঘোষিত শিল্পাঞ্চলগুলোকে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা। পাশাপাশি বিভিন্ন লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রদানের সময়সীমা নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য পূর্বনির্ধারিত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে।
ক্ষুদ্র আকারের পিপিপি প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগকে অধিক ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত সরকারি জমি, স্থাপনা, শেয়ার ও অন্যান্য সম্পদ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি পেলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও সময় কমবে। এতে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের সম্ভাবনা বাড়বে এবং শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা গেলে ব্যবসা নিবন্ধন থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুমোদন গ্রহণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে।
মন্ত্রিসভার একই বৈঠকে ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’ এবং ‘আমদানি নীতি আদেশ, ২০২৬-২০২৯’-এর খসড়াও অনুমোদন পেয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি কৌশলপত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে নতুন আমদানি নীতিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আধুনিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমদানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ, অনলাইন অনুমোদন ব্যবস্থা এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগে অতিরিক্ত সুবিধা প্রদানের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সরকারের প্রত্যাশা, ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’ কার্যকর হলে বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা ও দায়িত্বের দ্বৈততা কমে আসবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি আধুনিক, সমন্বিত ও বিনিয়োগবান্ধব কাঠামো গড়ে উঠবে, যা দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
