আন্দোলনের পাশাপাশি গণমাধ্যমও সমালোচনার কেন্দ্রে
ভারতে চলমান ছাত্র আন্দোলনে সরকারের পাশাপাশি মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধেও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তরুণ বিক্ষোভকারীরা। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দেশের গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থের ইস্যুগুলো উপেক্ষা করে একাংশের সংবাদমাধ্যম ক্ষমতাসীনদের অবস্থানকে প্রাধান্য দিয়েছে। ফলে সংবাদমাধ্যমের প্রতি তরুণদের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানে চলমান ছাত্র আন্দোলনে সরকারের জবাবদিহির দাবির পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাও বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। আন্দোলনকারীদের হাতে থাকা পোস্টার, স্লোগান এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মূলধারার কিছু গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠে এসেছে। ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের সঙ্গে কিছু সাংবাদিকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতে দেখা গেছে বিক্ষোভকারীদের।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—শিক্ষার্থীরা শুধু সরকারের নীতির সমালোচনাই করছেন না, একই সঙ্গে সরকারের সঙ্গে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক নিয়েও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন।
যন্তর মন্তরসহ আন্দোলনের বিভিন্ন স্থানে নির্দিষ্ট কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। কোথাও তাঁদের উদ্দেশে স্লোগান দেওয়া হয়েছে, কোথাও কটাক্ষ করা হয়েছে। কয়েকটি স্থানে আন্দোলনকারীরা কিছু সংবাদকর্মীকে বিক্ষোভস্থল ছেড়ে যেতে বলার ঘটনাও ঘটেছে।
ভারতে বর্তমানে প্রায় ৯০০টি বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে, যার প্রায় অর্ধেকই সংবাদ সম্প্রচার করে। এত বড় সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও তরুণদের একাংশের মধ্যে প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের প্রতি অনাস্থা বাড়ছে বলে আলোচনায় উঠে এসেছে।
ভারতে একাংশের টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমকে সমালোচনামূলকভাবে বোঝাতে ব্যবহৃত ‘গোদি মিডিয়া’ শব্দটি এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিতি পেয়েছে।
তবে এই সমালোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছে এমন একটি প্রজন্ম, যাদের বড় অংশ নিয়মিত টেলিভিশন সংবাদ দেখে না কিংবা দৈনিক পত্রিকা পড়ার অভ্যাসও আগের প্রজন্মের মতো নয়।
তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের অর্ধেকের বেশি সংবাদ পাওয়ার প্রধান মাধ্যম হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বেছে নিচ্ছেন। ফলে সংবাদ সম্পর্কে তাঁদের ধারণা তৈরি হচ্ছে মূলত ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, সংবাদমাধ্যমের প্রতি তরুণদের অনাস্থার অন্যতম কারণ হলো জনগণ ও সাংবাদিকতার মধ্যকার বিশ্বাসের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়া।
তরুণদের অভিযোগ, বেকারত্ব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। বরং কিছু টেলিভিশন চ্যানেল এসব সমস্যাকে খাটো করে দেখিয়েছে বা বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও কিছু টেলিভিশন চ্যানেল সংকটের গুরুত্ব অস্বীকার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ দীর্ঘ সময় বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় বহু শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল।
বর্তমানেও চাকরির সংকটকে অস্বীকার করার প্রবণতার সমালোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ শিক্ষাজীবন ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পরও কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের মুখে পড়ছেন অসংখ্য তরুণ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান প্রজন্মের কাছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু সংবাদ গ্রহণের মাধ্যম নয়, বরং মত প্রকাশ ও জনমত গঠনের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।
ভিডিও, মিম এবং সংক্ষিপ্ত ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এসব মাধ্যম তরুণদের ক্ষোভ ও দাবিকে আরও বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছে দিচ্ছে।
প্রতিবেদনটিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, গত এক দশকে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যম তাদের প্রতিবেদনে প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষ থাকতে পেরেছে কি না।
এতে আরও বলা হয়েছে, দেশের পরবর্তী প্রজন্মের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ যথাযথভাবে সংবাদে প্রতিফলিত হয়েছে কি না—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতে মোট ৮০৫ বার ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া ২০২৫ সালেও দেশটিতে ৬৫ বার ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করা হয়েছে। লেখাটিতে বলা হয়েছে, ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণের আলোচনায় এই পরিসংখ্যানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনটির উপসংহারে বলা হয়েছে, ছাত্র আন্দোলনের ভবিষ্যৎ যেদিকেই যাক না কেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে সংবাদমাধ্যম ও তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যকার আস্থার সংকট নিয়ে।
জনগণের সঙ্গে সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের সক্ষমতা কতটা ফিরে আসে, তার ওপরই ভারতের সংবাদব্যবস্থার ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে।
