ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লার যন্তর মন্তরে চলমান ছাত্র আন্দোলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি চালাচ্ছে দিল্লি পুলিশ। পুলিশের দাবি, এর উদ্দেশ্য পরিচিত অপরাধীদের শনাক্ত করা। তবে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, এই নজরদারি তাঁদের মধ্যে ভীতি তৈরি করছে, যার কারণে অনেকেই পরিচয় গোপন রাখতে মুখ ঢেকে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্র যন্তর মন্তরের কাছে কেরালা হাউসের বাইরে দিল্লি পুলিশ দুটি আধুনিক নজরদারি যান মোতায়েন করেছে। এর মধ্যে বড় যানটি ‘মোবাইল কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ভেহিকেল’, যেখানে বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা থেকে আসা সরাসরি ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত ছোট ‘ইক্ষণ’ নামের যানটিতে ফেসিয়াল রিকগনিশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে ভিডিও বিশ্লেষণ করছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।
সংস্কৃত শব্দ ‘ইক্ষণ’-এর অর্থ ‘দেখা’ বা ‘পর্যবেক্ষণ’। এআইচালিত সফটওয়্যারটি ভিডিওতে দৃশ্যমান প্রতিটি মুখ শনাক্ত করে পুলিশের অপরাধী তথ্যভান্ডারে থাকা ছবি ও তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। ২০২৩ সালে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের আগে এই প্রযুক্তিসমৃদ্ধ যানটি দিল্লি পুলিশের বহরে যুক্ত করা হয়। এতে ৩৬০ ডিগ্রি নজরদারির জন্য আটটি অত্যাধুনিক ক্যামেরা রয়েছে এবং প্রশিক্ষিত সিসিটিভি অপারেটররা এটি পরিচালনা করেন।
দিল্লি পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশ্চিত করেছেন, আন্দোলনস্থলে সরাসরি ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, “অপরাধীদের ছবিসংবলিত একটি বড় তথ্যভান্ডার আমাদের কাছে আছে। তাই এলাকার বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা থেকে পাওয়া ফুটেজে চেহারা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখা হয়, সফটওয়্যারটি আমাদের অপরাধী তথ্যভান্ডারে থাকা কারও সঙ্গে কোনো মুখের মিল খুঁজে পায় কি না।”
তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, পুলিশের এই অব্যাহত নজরদারি তাঁদের নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের জটিলতা এড়াতে অনেকেই মুখ ঢেকে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন।
দিল্লিতে ইউপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন রাজস্থানের এক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, “আমি ও আমার বন্ধুরা আন্দোলনের জন্য দারুণ সব পোস্টার বানিয়েছি। কিন্তু ক্যামেরা দিয়ে সারাক্ষণ আমাদের পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ভিডিও ধারণ করা হচ্ছে। এ জন্য পোস্টার ধরার সময় আমাদের মুখ ঢেকে রাখতে হচ্ছে। আমরা সবাই সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। তাই পুলিশের তথ্যভান্ডারে আমাদের পরিচয় সংরক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি নিতে চাই না।”
মুখ ঢেকে আন্দোলনে অংশ নেওয়া আরেক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, “পুলিশ যে ভিডিও ধারণ করছে, সেখানে আমার স্লোগান দেওয়া বা পোস্টার হাতে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য যদি কোনোভাবে আমার মা–বাবার কাছে পৌঁছে যায়, তাহলে কী হবে? আমি যে এখানে এসেছি, তা তাঁরা জানেন না। আমি কেন এ আন্দোলনে অংশ নিচ্ছি, সেটাই তাঁরা বোঝেন না।”
ভিডিও ফুটেজ কত দিন সংরক্ষণ করা হবে—এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই বলে জানিয়েছেন দিল্লি পুলিশের আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তাঁর বক্তব্য, আন্দোলনে কোনো বিশৃঙ্খল ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে বা কয়েক মাস পরও তদন্তের প্রয়োজন হতে পারে। সে কারণে ভিডিও কত দিন সংরক্ষণ করা হবে, তা আগে থেকে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
এদিকে, পুলিশের এই নজরদারি নিয়ে বিষয়টি আদালতেও গড়িয়েছে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) ছাত্র সংসদের সাবেক সভাপতি আইশে ঘোষ দিল্লি হাইকোর্টে করা এক আবেদনে অভিযোগ করেছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচার ও অনধিকারমূলক নজরদারি চালানো হয়েছে। আবেদনে স্থায়ী নজরদারি টাওয়ার স্থাপন এবং সার্বক্ষণিক ভিডিওগ্রাফার মোতায়েনের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টার এ ধরনের নজরদারি বিক্ষোভকারীদের গোপনীয়তা, ব্যক্তিগত মর্যাদা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন করছে।
গত ২০ জুলাই মামলার শুনানিতে দিল্লি পুলিশের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা হাইকোর্টকে জানান, যন্তর মন্তরে ভিডিও ও ছবি ধারণের একমাত্র উদ্দেশ্য আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এটি নজরদারি বা গুপ্তচরবৃত্তির উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে না। পরে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন আদালত।
ভারতে নাগরিকদের ওপর ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির ব্যবহার ডিজিটাল পারসোনাল ডেটা প্রটেকশন আইন, ২০২৩-এর আওতায় পড়ে। তবে এই আইনে দিল্লি পুলিশের মতো নিরাপত্তা সংস্থা ও অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য বিস্তৃত ছাড় রাখা হয়েছে, ফলে আইনের অনেক সুরক্ষামূলক বিধান তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না।
বর্তমানে ভারতজুড়ে আধুনিক পুলিশি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সিসিটিভি নেটওয়ার্ক, ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি, ড্রোনভিত্তিক নজরদারি, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ (এএনপিআর) এবং এআইনির্ভর ভিডিও বিশ্লেষণ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব প্রযুক্তি জননিরাপত্তা নিশ্চিত ও অপরাধ দমনে কার্যকর। তবে নাগরিক অধিকারকর্মীদের মতে, প্রযুক্তির এই বিস্তৃত ব্যবহার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, স্বচ্ছতা, প্রয়োজনীয়তার সীমা এবং কার্যকর আইনি তদারকির অভাব নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করছে।
ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি কোনো ব্যক্তির মুখের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে একটি স্বতন্ত্র ডিজিটাল টেমপ্লেট তৈরি করে এবং সেটিকে তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত ছবির সঙ্গে তুলনা করে সম্ভাব্য মিল শনাক্ত করে। ২০২২ সালে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় দেওয়া এক জবাবে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছিল, তাদের ব্যবস্থায় ৮০ শতাংশ নির্ভুলতার হার অর্জিত হলে সেটিকে ‘ইতিবাচক মিল’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
